বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম সরোয়ার হিরুকে অন্তত ১০ হাজার মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে চিরবিদায় জানানো হয়েছে। বুধবার (২৯ জুলাই) প্রবল বৃষ্টির মধ্যে তাঁর শেষ জানাজায় জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে পুরো কালমেঘা এলাকা পরিণত হয় শোকাবহ এক জনসমাগমে।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের নিজ বাড়ি সংলগ্ন কালমেঘা মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তাঁর তৃতীয় ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়দের হিসাবে, জানাজায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকার একটি মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার সকাল ১০টায় পাথরঘাটা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ নিজ এলাকায় আনা হয়। এরপর কালমেঘা মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় ও শেষ জানাজা।
শেষ জানাজায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, আলেম-ওলামা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। প্রিয় এই নেতাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে হাজারো মানুষ সকাল থেকেই জানাজার মাঠে ভিড় করেন। কানায় কানায় পূর্ণ মাঠ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নামে। উপস্থিত সবাই তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু, আর পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছিল গভীর শোকের আবহ।
২৭ জুলাই সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাম সরোয়ার হিরু ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
১৯৪৯ সালের ৩০ আগস্ট বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন গোলাম সরোয়ার হিরু। বরগুনার রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সুপরিচিত ও প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রার্থী হিসেবে বরগুনা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে রাজনৈতিক সংকটের কারণে ওই সংসদ বিলুপ্ত হলে একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ঐক্য জোটের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় একই আসন থেকে বিজয়ী হন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই বছরে দুটি ভিন্ন দলের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল নজির স্থাপন করেন তিনি।
এর আগে তিনি কালমেঘা ইউনিয়ন পরিষদের তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন এবং পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
২০১৩ সালের বরগুনা-২ আসনের উপনির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি । ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই দলের প্রার্থী ছিলেন। পরে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে নতুন করে আলোচনায় আসেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন দলে সম্পৃক্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি ভূমিকা রাখেন। তাঁর মৃত্যুতে বরগুনার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়দের মতে, গোলাম সরোয়ার হিরুর মৃত্যুতে বরগুনাবাসী একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জননেতাকে হারিয়েছে, যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
পড়ুন: ১৪৪ ধারার মধ্যেই হবিগঞ্জে বিক্ষোভ করতে যাচ্ছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা
আর/


