বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ খাদ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে অস্তিত্বহীন মিলের নামে চালের বরাদ্দ আজ নতুন নয়। বছরের পর বছর এমন অনিয়ম হয়ে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না ওই সমস্ত মিলের বিরুদ্ধে। আর এমন অনিয়মের ফাঁকেই সংশ্লিষ্ট খাদ্য কর্মকর্তারা লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এর সাথে খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার পাশাপাশি জড়িত রায়গঞ্জে প্রভাবশালী চালকল মালিকেরাও।

বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে থেকে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২০২৬ সালে বোরো সংগ্রহে ৯টি উপজেলায় ২৬৫ কোটি টাকার চাল ক্রয়ে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রায়গঞ্জ উপজেলায় ১৮ হাজার ২০ মে. টন চাল ১৩৭টি মিলকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১৩৭টি মিলারদের নিকট ৪৯ টাকা কেজি দরে প্রায় ১৮ হাজার ২০ মেট্রিক টন চাল কেনার চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য বিভাগ।

জানা যায়, রায়গঞ্জে পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী সর্বমোট প্রায় ২০৪টি রাইস মিল রয়েছে। এসব মিলারদের নিকট থেকেই সংগ্রহ করা হয় সরকারের আপদকালীন চাল। চাল সরবরাহে চালকল মালিকদের যেপরিমান বরাদ্দ আসে তাতে বিপুল অর্থ পকেটে যায় মিলার অর্থাৎ চালকল মালিক ও কতিপয় কর্মকর্তারসহ খাদ্য গুদামের পরিদর্শকের নিকট।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চাল সরবরাহ লাভজনক হওয়ায় অস্তিত্বহীন মিলের নামেও দেয়া হয় চালের বরাদ্দ। যার সংখ্যাও কম নয়। উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা গ্রামের ‘লুৎফা সেমি অটো, ওমর সেমি অটো চালকল’। ওই মিলের কোনো অস্তিত্ব নেই প্রায় এক যুগেরও বেশি সময়। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ায় মালিক মো. শহিদুল ইসলাম মিলটি বন্ধ করে দিয়েছেন। বছরের পর বছর এই মিলের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাতে জন্মেছে আগাছা। বয়লারেরও অস্তিত্ব নেই। সাইনবোর্ড না থাকায় চেনারও উপায় নেই। অথচ বন্ধ এই মিলের বাপ-ছেলে মিলে একই চাতালে ৪টি লাইন্সেস দেখিয়ে বছরের পর বছর চালের বরাদ্দ নিয়ে আসছে। এবারের বিভাজনেও দেয়া হয়েছে ১৪৭ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ।

একই চিত্র আনোয়ারা চালকল, সারা চালকল, কহিনুর সেমি অটো চালক, সমন্ময় চালকাল, পিতা-পুত্র সেমি অটো চালকল, মামা-ভাগ্নে সেমি অটো চালকল, সোহাগ-৩ সেমি অটো চালকল, সোনালী সেমি অটো চালকল, প্রতিক সেমি অটো চালকল, খাজা সেমি অটো চালকল, হাজী কাউসার সেমি অটো চালকল, নুসরাত চালকল, সরকার চালকল ও রাফি চালকল, লুৎফা সেমি অটো, ওমর সেমি অটো চালকল এরা একটি চাতাল দেখিয়ে ৩/৪টি লাইসেন্স দিয়ে এই বরাদ্দগুলো নিয়েছে। ১৩৭টি চালকলের মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫টি মিলের মধ্যে অধিকাংশ মিলেরই অস্তিত্ব নেই। ধানের চাতাল আছে, কার্যক্রম নেই। বছরের পর বছর ধরে বয়লারে আগুন জ্বলে না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিলগুলো প্রতারণা করে খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এই বরাদ্দগুলো নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও এই মিলগুলো ২০১৩ সালের পর থেকে কোন ছাড়পত্র নবায়ন নেই।

চান্দাইকোনা গ্রামের সৌরভ-২ সেমি অটো চালকলের মালিক স্বদেশ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, আমার এবং আমার ভাইয়ের চালকল প্রায় ৫ বছরে ধরে বন্ধ। আমরা আমাদের সমিতির মাধ্যমে প্রতিবছরই বরাদ্দ পায়। এবার আমি ৬২ মে. টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি। চালকল বন্ধ থাকায় আমিসহ অন্যান্য চালকলের মালিকরা অন্য মিল থেকে চাল কিনে চান্দাইকোনা সরকারি খাদ্য গোদামে দেয়।

কীভাবে এবং কেনইবা অস্তিত্বহীন মিলের নামে বরাদ্দ দেয়া হয় চালের? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো মিলের নামে চালের বরাদ্দ দেয়ার আগে ওই সমস্ত মিল বরাদ্দ পাবার যোগ্য কিনা সেবিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। ওই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে দেয়া হয় বরাদ্দ। কিন্তু খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা দায়সারা প্রতিবেদনে বন্ধ এবং অস্তিত্বহীন মিলের নামেও বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে এসব মিলারদের কাছ থেকে নির্দিষ্টহারে কমিশন পান। যার পরিমাণও কম নয়। কয়েক কোটি টাকা। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ।

এদিকে রায়গঞ্জবাসীর দাবী, বছরের পর বছর অস্তিত্বহীন মিলের নামে চালের বরাদ্দের অভিযোগ শুনে আসছি সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। সরকার কোনো মিলের সঙ্গে চুক্তি করার আগে মিলগুলো চাল সরবরাহের যোগ্য কিনা তা যাচাই বাছাই করে থাকে। যদি সঠিকভাবে তদন্ত করা হয় সেক্ষেত্রে এমন অনিয়ম হবার কথা নয়। সংশ্লিষ্ট মিল মালিক এবং খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।

রায়গঞ্জ উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজের একটি চাতালে ২টি লাইন্সেস। তিনি এ বিষয়ে জানান, চাল বরাদ্দের সাথে আমাদের সংগঠন জড়িত নয়। অস্তিত্বহীন মিলের নামে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন।

এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সেরাজুল ইসলাম সরকার জানান, উপজেলাতে চাল বরাদ্দের তালিকা তৈরীর জন্য একটি কমিটি থাকে। সেই কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, খাদ্য গুদামের পরিদর্শক মিলে আমরা একটি তালিকা পাঠায় জেলা অফিসে। তারা যাছা-বাছাই করে বরাদ্দ দেয়। এখানে আমার কিছু করার নেই।

চান্দাইকোনা খাদ্য গুদামের পরিদর্শক (ওসি এলএসডি) তন্ময় বিশ্বাস বলেন, এই বার যাছা-বাছাই কমিটিতে আমি নেই। এই বিষয়ে আমার জানা নেই। অভিযোগ রয়েছে খাদ্য গুদামে এবার নন গেডের চাল নেওয়ার হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এরিয়ে যান।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, অস্তিত্বহীন মিলের নাম বরাদ্দ তালিকায় নেই। যেসব মিল বন্ধ রয়েছে সেসব মিলের সঙ্গে চুক্তি করা হয়নি। তবে এর বাইরেও যদি কোনো মিলের অসঙ্গতি থাকলে ওইসব মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পড়ুন : ৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন