বিজ্ঞাপন

খাদ্যসংকট ও টিকার অভাব: ফকিরহাটে মানুষ-কুকুর সংঘাত তুঙ্গে, নেই সরকারি ব্যবস্থাপনা

বাগেরহাটের ফকিরহাটে রাস্তাঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতি। একদিকে আক্রান্তদের জন্য জলাতঙ্ক প্রতিরোধক রেবিস টিকার চাহিদা বাড়লেও সরকারি হাসপাতালে তা মিলছে না। অন্যদিকে, ক্ষিপ্ত ও হিংস্র কুকুর ব্যবস্থাপনা কিংবা নিয়ন্ত্রণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে কোনো সরকারি কাঠামো না থাকায় সংঘাত দিন দিন চরম রূপ নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রের খবর, ফকিরহাটে বেওয়ারিশ কুকুরের সঠিক কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে এসব কুকুরের বন্ধ্যাকরণ, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান কিংবা খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্যও নেই কোনো প্রকল্প বা বাজেট। সিটি কর্পোরেশনের মতো উপজেলা পর্যায়ে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় একাধারে যেমন কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি তীব্র হচ্ছে খাদ্যসংকট।

​উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. হাসান আলী জানান, সচেতনতার কারণে মানুষ এখন মরা পশু বা হাঁস-মুরগি খালে বা মাঠে না ফেলে মাটিচাপা দিচ্ছে এবং সরকারিভাবে সরবরাহ করা ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন ব্যবহার করছে। এতে রাস্তায় থাকা বিপুল সংখ্যক কুকুরের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে।
​সরেজমিনে উপজেলার আট্টাকী, পাগলা-শ্যামনগর, ছোট হুচলা ও টাউন নওয়াপাড়াসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৫টির দলবদ্ধ কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাতে খাবার থাকা পথচারী, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। সন্ধ্যার পর পথচলা হয়ে উঠছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

পাশাপাশি ক্ষুধার তাড়নায় ছাগল, হাঁস-মুরগি ও গরু-বাছুরের ওপর কুকুরের আক্রমণ বাড়ছে। সম্প্রতি দলবদ্ধ কুকুরের হামলায় বেশ কয়েকটি ছাগল ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু হয়েছে।

​অপরদিকে, উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু মানুষ নিষ্ঠুরভাবে বেওয়ারিশ কুকুরের ওপর হামলা চালাচ্ছে। বাজারসংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু কুকুরের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গরম পানিতে চামড়া ঝলসে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। ফলে মানুষ ও তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী কুকুরের এই সংঘাত এখন স্থানীয় সচেতন মহলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

গত ৩ জুলাই কাজে যাওয়ার সময় কুকুরের আক্রমণের শিকার হন সৈয়দমহল্লা গ্রামের বাসিন্দা লাবিব হোসেন। আতঙ্কে সাইকেল থেকে পড়ে গেলে কুকুর তার পা ও উরুতে কামড় দেয়। আতঙ্কগ্রস্ত লাবিব বলেন, “এখন রাস্তায় কুকুর দেখলেই ভয় লাগে। রাতে সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়।

​পাগলা-শ্যামনগর গ্রামের কৃষক রহমান শেখ জানান, গত ১৭ জুলাই তার একটি গাভীকে কুকুর কামড় দিলে তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখান থেকে জানানো হয় হাসপাতালে রেবিস টিকা নেই। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে বাইরে থেকে টিকা কিনে গাভীকে দেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “হাসপাতালে মানুষের জন্যই টিকা নেই, পশুর কথা তো ভেবে লাভ নেই। গরিব মানুষ হয়েও ধার করে টিকা কিনতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপে পড়েছি।

​ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেবিস টিকার তীব্র সংকট রয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. কামাল হোসেন জানান, গত ১ জুলাই অর্থবছরের শুরুতে নিজ উদ্যোগে জেলা থেকে ২৫৪টি টিকা আনলেও তা মাত্র ১০ কার্যদিবসে শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনে আনতে হচ্ছে। নিঃস্ব অনেক রোগী বিনামূল্যে সরকারি টিকার আশায় বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ছুটছেন। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ২৬ জন রোগী কুকুর-বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে ক্ষতবশত টিকা নিতে আসছেন।

পশু চিকিৎসক খান আরিফসহ স্থানীয় অভিজ্ঞদের মতে, আগে কুকুর গ্রামের উচ্ছিষ্ট খাবার ও ফেলা দেওয়া পশুর মৃতদেহ পেত। কিন্তু এখন উচ্ছিষ্ট খাবার মাছের ঘেরে ব্যবহার হচ্ছে এবং রোগে হাঁস-মুরগির মৃত্যু কমেছে। ফলে খাদ্যের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকে থাকার তাগিদে কুকুর লোকালয় ও গবাদিপশুর দিকে হিংস্র হয়ে উঠছে।
​এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাসান আলী বলেন, “আইন অনুযায়ী কুকুর হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় এই সংঘাত নিরসন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি আরও জানান, গত তিন মাসে ফকিরহাট ভেটেরিনারি হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে আহত প্রায় ১০০টি গবাদিপশুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এ উপদ্রব আরও বাড়ে।

​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, “আইনগতভাবে কুকুর নিধনের সুযোগ নেই। কুকুরগুলোকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া গেলে ভালো হতো। তবে উপজেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ না থাকায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পড়ুন : টানা পঞ্চমবার পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

সা/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন