শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের সমর্থনই বিএনপির মূল শক্তি। জনগণ পাশে থাকলে তাদের স্বার্থে নেওয়া সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রপাড়ে আয়োজিত এক জনসভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষকে শুধু সহায়তা দিয়ে নির্ভরশীল করে রাখা নয়, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। দেশের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, নতুন মিল-কারখানা স্থাপন এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তিকে দেশের উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করতে হবে। প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের শ্রমের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতিবৃষ্টিজনিত সাম্প্রতিক বন্যায় অনেক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ১০০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুস্থ নারীদের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড অন্যতম। সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই এর পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয় এবং তা শেষ হয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট থেকে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি বছর সারাদেশে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলায় আগামী অর্থবছরের মধ্যে ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবারের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী চার বছর পর্যায়ক্রমে আরও পরিবারকে এর আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, পরিবারের পাশাপাশি নারীদেরও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। তারা যেন সংসারের হাল ধরতে পারেন, সন্তানদের লেখাপড়া ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারেন এবং একটি স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তুলতে পারেন, সে লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
লবণচাষিদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, লবণের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করা হবে, যাতে লবণচাষিরা উৎপাদন খরচ মিটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। শিগগিরই নির্ধারিত মূল্য সবাইকে জানানো হবে।
সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসম্পদের অধিকারী। মীরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলকে শিল্প ও বাণিজ্যের কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
তিনি বলেন, এদিন মাতারবাড়ী পরিদর্শন করেছেন এবং মীরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত পুরো অঞ্চল হেলিকপ্টারে দেখেছেন। সমুদ্রকে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নত করার পরিকল্পনা নিতে হবে।
চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে আলোচনার পর চট্টগ্রামে বড় পরিসরে শিল্প-কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে কয়েকশ মিল-কারখানা গড়ে উঠলে চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দেশের ৫০৩টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশ চান, যেখানে কারখানার উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ নির্বিঘ্নে করা যায়।
তিনি বলেন, দেশে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। যারা শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায়, তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে ঝগড়া-বিবাদ ও বিভ্রান্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আগামী ১০ বছরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিকল্পনাও জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এখন আর পেছনে তাকিয়ে থাকার সময় নেই। দেশের মানুষের জন্য কাজ করার এবং দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার সময় এসেছে। বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের পরে স্বাধীন হলেও পরিশ্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশকেও এখন একইভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, এখন একটাই লক্ষ্য—জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন এবং দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন।
জনসভায় বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা আবদুল করিম।
পড়ুন:জুয়া খেলায় নিষেধ করায় কলেজ শিক্ষককে কুপিয়ে জখম, হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন
ইমি/


