রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-১-এর ২ নম্বর গেট ও বিআরটিসি-সংলগ্ন সার্ভিস রোড ঘেঁষে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ ভাসমান দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
বুধবার দুপুরে পরিচালিত অভিযানে সার্ভিস রোডের পাশে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিন পর দখলমুক্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের পাশের অংশ। স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে।
ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও মারুফা বেগম নেলির নেতৃত্বে এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অভিযান সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিকুঞ্জ-১-এর ২ নম্বর গেট ও বিআরটিসি-সংলগ্ন সার্ভিস রোডটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এ পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশের জায়গা দখল করে একের পর এক ভাসমান দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে ওঠায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল।
ছোট পরিসরে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এসব অবৈধ স্থাপনা বাড়তে থাকে। দোকানের সামনে মালামাল রাখা, ক্রেতাদের ভিড় এবং বিভিন্ন যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে সার্ভিস রোডের স্বাভাবিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। অনেক সময় পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ জায়গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে এর আগেও একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিবারই অভিযানের পর জায়গাটি কিছুদিন দখলমুক্ত থাকলেও পরে আবার সেখানে নতুন করে দোকানপাট বসে যায়। ফলে বারবার অভিযান পরিচালনা করেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় দখলদারেরা উচ্ছেদের পর আবারও জায়গাটি দখলে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এ কারণে বুধবারের অভিযানকে তাঁরা স্বাগত জানালেও এবার যেন আর পুনরায় দখল না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নিকুঞ্জের বাসিন্দা, স্থানীয় কল্যাণ সমিতি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ জায়গাটি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, নিকুঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথের পাশে থাকা সার্ভিস রোডটি কোনোভাবেই অবৈধ দখলের কবলে রাখা যাবে না। অবশেষে ডিএনসিসির অভিযানে জায়গাটি দখলমুক্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, “দীর্ঘদিনের দাবির পর ডিএনসিসির এই উচ্ছেদ অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই।
বিআরটিসি-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এই সার্ভিস রোডটি অবৈধ দখলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে ছিল। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি বলেন, “তবে শুধু উচ্ছেদ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। এর আগে অভিযান চালানোর পরও কয়েক দিনের মধ্যে জায়গাটি আবার দখল হয়েছে। এবার যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি জায়গা ও জনসাধারণের চলাচলের পথ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে থাকতে পারে না।”
জাহিদ ইকবাল আরও বলেন, “আমরা কারও জীবিকার বিরুদ্ধে নই, আমরা অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে। মানবিকতা ও আইনের সমন্বয়ে স্থায়ী সমাধান চাই। নিকুঞ্জকে পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিআরটিসি-সংলগ্ন হওয়ায় এলাকাটি এমনিতেই ব্যস্ত থাকে। এর সঙ্গে সার্ভিস রোডের পাশে অবৈধ দোকানপাট গড়ে ওঠায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে বাড়তি চাপ তৈরি হতো। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠত।
এ ছাড়া দোকানপাটের কারণে সড়কের পাশের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও দোকানের মালামাল যত্রতত্র পড়ে থাকায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল।
স্থানীয়দের মতে, কোনো এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার পর তা ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। শুরুতেই যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে পরে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান প্রয়োজন হয় না। তাই ভবিষ্যতে নিকুঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফুটপাত ও সরকারি জায়গায় নতুন করে কোনো দখলের চেষ্টা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁদের।
বুধবারের উচ্ছেদ অভিযানে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও অতীতের অভিজ্ঞতা তাঁদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারছে না। তাঁদের আশঙ্কা, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর আবারও সেখানে দোকানপাট বসতে পারে।
তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার উচ্ছেদের পর জায়গাটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং নিয়মিত নজরদারি থাকবে। নতুন করে কেউ দখলের চেষ্টা করলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর মতে, জনস্বার্থে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান শুধু অবৈধ স্থাপনা সরানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবেই নিকুঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এ সার্ভিস রোডটি প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিনের দাবির পর বুধবারের অভিযান তাই স্থানীয়দের কাছে স্বস্তির খবর। তবে তাঁদের প্রত্যাশা একটাই—আজ যে সার্ভিস রোডটি দখলমুক্ত হলো, সেটি যেন আবার নতুন করে দখলের শিকার না হয়।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

