প্রায় তিন দশক ধরে ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের রুপনগরে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এলেও, জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সরেজমিনে তাদের খোঁজ নিতে বা তাদের জীবন-মান উন্নয়নের জন্য সেখানে যাওয়ার ঘটনা ছিল না। এবার পিছিয়ে পরা এই জনগোষ্ঠীর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম। পিছিয়ে পরা এই জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বদলের জন্য বিভিন্ন সহায়তাসহ উন্নয়নের একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ধামরাই উপজেলার আয়োজনে বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুল্লা ইউনিয়নের রুপনগর বেদে পল্লীতে যান জেলা প্রশাসক। সেখানে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে শুনেছেন তাদের জীবনযাপন, দীর্ঘদিনের সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে দিয়েছেন নানা উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস।
জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে পল্লীর ৬৩টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয় শুকনা খাবার। এর পাশাপাশি যাদের ঘরের অবস্থা খারাপ, চাল নাই এমন ১২ জনকে ঢেউটিন দেয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেককে ৬ হাজার টাকা করে মোট ৭২ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বেদে পল্লীর ১১৩ জন নারীদের মধ্যে শাড়ি ও থ্রিপিস বিতরণ ও ২০০ শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে খেলনা।
তবে এসব সহায়তা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ডিসি ফরিদা খানম। বেদে জনগোষ্ঠীর স্থায়ী উন্নয়নের জন্য নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি। উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে বেদে পল্লীর জন্য ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া, খাসজমি বরাদ্দ এবং ২৫টি সেলাই মেশিন দেওয়ার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। যা আগামী এক সাপ্তাহের মধ্যে প্রদান করা হবে।
এদিকে, ধামরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আল মামুন এর দিনব্যাপী বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতেও অংশ নেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। শিক্ষার মানোন্নয়নে উপজেলার ৫২টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে এবং উপজেলার বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় এ-প্লাস পাওয়া ১৮৬ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
এছাড়াও ৪২ জন প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় স্কুল ড্রেস, ব্যাগ ও জুতা। উদ্যোক্তা ও আত্মকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় ঋণ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্পোর্টস ক্লাবে দেওয়া হয় ক্রীড়া সামগ্রী। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য পরিচালিত স্কুলে বিতরণ করা হয় শিক্ষা উপকরণ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেওয়া হয় হুইলচেয়ার এবং তিনটি প্রতিবন্ধী স্কুলে বিতরণ করা হয় শিক্ষা উপকরণ। আব্দুস সোবহান মডেল স্কুল এন্ড কলেজে প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় ৭শত শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে একটি করে চারা গাছ।
‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ জন দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির মধ্যে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা। গ্রাম পুলিশদের মধ্যে বিতরণ করা হয় পোশাক ও সরঞ্জাম।
ধামরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আল মামুন বলেন, আজ সারাদিনব্যাপী উপজেলার আয়োজনে সকল প্রোগ্রামে খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম স্যার। আমরা ঠিক সকালবেলা শুরু করেছিলাম আমাদের উদ্যোক্তা যারা আছেন তাদের কে ঋণ দেয়ার চেক বিতরণের মাধ্যমে। তার মধ্যে একজন প্রতিবন্ধী স্বাস্থ কর্মী ছিলেন তাকে আমরা ৪ লাখ টাকার চেক বিতরণ করেছি। প্রতিবন্ধী স্কুলে খেলনা সামগ্রী, হুইলচেয়ার বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছি। এছাড়াও হ্যালো ডিসি’ অ্যাপের মাধ্যমে আবেদনকারীদের সহায়তা, কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে মতবিনিময় সভা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের বিভিন্ন সহায়তাসহ আরো বেশ কিছু প্রোগ্রাম করা হয়েছে। সকল প্রোগ্রামই খুব সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে।
এসময় বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের উদ্দেশ্য করে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম বলেন, সমাজের কোনো মানুষ যেন উন্নয়ন ও সরকারি সেবার বাইরে না থাকে, সেই লক্ষ্যেই প্রশাসন কাজ করছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও ধরাইয়ের উন্নয়নের জন্য সার্বিকভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
দীর্ঘ ৩০ বছর পর ধামরাইয়ের রুপনগরের বেদে পল্লীতে জেলা প্রশাসকের এই সরেজমিন উপস্থিতি। তাই শুধু সহায়তা বিতরণের আয়োজন নয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের সরকারি সেবার আওতায় আনার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের বার্তাও দিচ্ছে।
পড়ুন : তালতলীতে আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসনের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন


