চট্টগ্রাম নগরীতে মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে কর্মব্যস্ততা। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না গণপরিবহন। বরং বছরের পর বছর নতুন যানবাহন নামার পথ বন্ধ থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি। সকাল কিংবা বিকেল—গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজগুলোতে বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সারি এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের চিত্র।
দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে নগরীতে নতুন করে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন বন্ধ। একইভাবে প্রায় সাত বছর ধরে অটো টেম্পোসহ বিভিন্ন যানবাহনের নিবন্ধন ও রুট অনুমোদনও কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় গণপরিবহণের সংখ্যা বাড়ছে না। গ্যারেজে পড়ে থাকা অনেক যানবাহনও অনুমোদনের অভাবে সড়কে নামতে পারছে না।
বিআরটিএর হিসাবে, চট্টগ্রাম নগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত রুট রয়েছে ১৭টি। এসব রুটে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি বাস-মিনিবাসের রুট অনুমোদন রয়েছে। তবে এর মধ্যে ৮০৩টি বাসের ফিটনেস নেই। বাস্তবে অনুপযোগী ও অনুমোদনহীন যানবাহনের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের।
নগরীতে অনুমোদিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১৩০টি। পাশাপাশি রয়েছে ২ হাজার ১৫৮টি টেম্পো, ৯৬৯টি হিউম্যান হলার এবং ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা। বিপুল জনসংখ্যার একটি ব্যস্ত মহানগরের জন্য এই সংখ্যা কতটা পর্যাপ্ত—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গণপরিবহণের ঘাটতি সামাল দিতে সড়কে বেড়েছে ছোট যানবাহনের আধিপত্য। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন সিএনজি অটোরিকশাও রয়েছে। এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল একদিকে যেমন যাত্রীদের বিকল্প তৈরি করেছে, অন্যদিকে তীব্র করেছে যানজট ও সড়ক বিশৃঙ্খলা।
পরিবহণ সংকটের আরেকটি বড় কারণ—যে সংখ্যক বাস নগরীতে রয়েছে, তার একটি অংশ নিয়মিত গণপরিবহণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে না। শিল্পকারখানার শ্রমিক পরিবহণ কিংবা রিজার্ভ ভাড়ায় চলে যাওয়ায় অফিসের ব্যস্ত সময়ে সাধারণ যাত্রীদের জন্য বাসের সংখ্যা আরও কমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাতায়াত করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নতুন যানবাহন নামানোর সুযোগ তৈরি না করে শুধু বিদ্যমান যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রাখলে সংকট আরও গভীর হবে বলেও মনে করছেন তারা।
পরিবহণ নেতা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, নগরীর মানুষের চাহিদার তুলনায় সড়কে প্রয়োজনীয় যানবাহন নেই। দীর্ঘদিন ধরে নতুন গাড়ির নিবন্ধন না হওয়ায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. মাসুদ আলমের দাবি, কোন রুটে কতটি যানবাহন চলবে, সেটি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই করতে হয়। নির্ধারিত সীমার বাইরে বিআরটিএ এককভাবে নতুন নিবন্ধন বা রুট অনুমোদন দিতে পারে না।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বৈঠকও করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—জনসংখ্যা ও নগরীর পরিধি যখন প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তখন বছরের পর বছর একই সংখ্যক গণপরিবহণ দিয়ে কি চট্টগ্রামের যাতায়াতের চাহিদা পূরণ সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যানজট নিয়ন্ত্রণ নয়, চট্টগ্রামের গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নতুন ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ বাড়ানো, রুটভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ, নির্ধারিত বাসস্টপেজ তৈরি এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন।
নগরবাসীর প্রশ্ন, প্রতিদিন কোটি মানুষের চলাচলের এই শহরে গণপরিবহণের সংকট আর কতদিন চলবে? আর কতদিন বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে নগরবাসীকে?
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

