বিজ্ঞাপন

২৪ ঘন্টা বালু আনলোডের জনজীবন অতিষ্ট! দেখা দিচ্ছে শারীরিক সমস্যা

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা নদীতে সিরাজগঞ্জ থেকে আনা ব্লাকহেডে মোটা বালুর আনলোডের পাশাপাশি যমুনা নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজিং এবং স্তূপ করে অবৈধভাবে বালু বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। দিন রাত ২৪ ঘন্টা চলে এই বালু আনলোডের (বালু নামানো বা খালাস করা) কাজ। আর এই সুযোগেই রাতের বেলায় যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়ারা। দিন রাত বাল্কহেড মাধ্যমে বালু আনলোড কিংবা ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে শব্দ দূষণের ফলে আশেপাশের বয়স্ক ও শিশুদের শারীরিক নানা ধরণের সমস্যার দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের কানে কম শুনা থেকে সমস্যা হচ্ছে ঘুমের। স্থানীয়রা দ্রুতই বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি করেন । বালু মহল নিয়ে ৩ পর্বের ধারাবাহিক নিউজ করেছেন নাগরিক টিভির টাঙ্গাইল প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল নোমান। আজ দেখছেন দ্বিতীয় পর্ব।

বিজ্ঞাপন

বিশেজ্ঞদের মতে, শব্দ দূষণের ফলে যে প্রভাব গুলি দেখা যায় তা খুবই ক্ষতিকারক পরিবেশের ক্ষেত্রে এবং মানুষের ক্ষেত্রেও। বাতাসে বালুর সূক্ষ্ম কণা মিশে ফুসফুসে প্রবেশ করায় হাঁপানি ও দীর্ঘমেয়াদি কাশি বাড়ছে। বালুর ধুলা ত্বকে লেগে চুলকানি ও নানা ধরনের এলার্জিজনিত ত্বকের রোগ তৈরি করছে। এছাড়া অতিরিক্ত শব্দ দূষণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের উপর প্রভাবসহ নানা অসুবিধা হচ্ছে।

কৃষি জমিতে বালু বা মাটি ভরাট নিষিদ্ধ
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানাধীন বা অন্য কোনো কৃষি জমিতে বালু বা মাটি ভরাট করা এবং সেখান থেকে মাটি বা বালু উত্তোলন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০২৩ সালে পাস হওয়া বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন অনুযায়ী কৃষিজমির টপসয়েল বা উর্বর মাটি রক্ষা এবং কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে এই কড়া নিয়ম করা হয়েছে। কিন্ত এ আদেশ অমান্য করে কৃষি জমিতে অবৈধভাবে বালু ভরাট করা হচ্ছে।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জের সাত্তার কমিশনার ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় মোটা বালুর ব্যবসার অন্তরালে শতশত বাল্কহেডের নদীর পাড় আর কৃষি জমির উপর স্তূপ করে রাখা বালু অবৈধভাবে বিক্রি চলছে। আর যমুনা তীরে এসব বালুর নিয়ন্ত্রণ করছেন ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ। কয়েক দফায় অভিযান পরিচালনা করা হলেও অদৃশ্য শক্তির বলে একদিন পর হতেই পুনরায় চালু হয় এসব বালু মহল।

যমুনা নদীর বালু স্থানীয়দের কাছে সাদাসোনা হিসেবে খ্যাত। বিগত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভূঞাপুরের নিকরাইল ও গোবিন্দাসী ইউনিয়নে অবৈধ বালুঘাট ছিল ১৯টি। এসব বালুঘাট সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার সাত্তার কমিশনার, ভূঞাপুর উপজেলা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ সহ স্থানীয় প্রভাশালী নিয়ন্ত্রণ করতেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এসব বালুর ঘাট নিয়ন্ত্রণ নেয় সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার সাত্তার কমিশনারের সহাতায় ‘চার খলিফা’ নামে খ্যাত ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু, কোষাধ্যক্ষ সোলায়মান হোসেন লিটন, নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মন্ডল। বর্তমানে ভূঞাপুর উপজেলায় অন্তত ৪০টি অবৈধ বালুঘাট সচল রয়েছে। প্রতিটি বালুঘাটে রয়েছে ৩-৪টি করে বালু তোলার পয়েন্ট।

ধুলা শরীরের লেগে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা
এদিকে ২৪ ঘন্টায় বালু আনলোডের কারণে স্থানীয়রা ঠিক মত ঘুমাতে পারছেন না। যার ফলে অনেক সময় মেজাজ খিটখিটে থাকে। বাতাসে বালু ধুলা শরীরের লেগে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। স্থানীয়রা এর দ্রুত সমাধান চান।
ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলনে তীব্র শব্দ হওয়ায় বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ
বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এই অপরাধ দমনে মূলত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং এর সর্বশেষ বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩ প্রয়োগ করা হয়। ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলন করলে তীব্র শব্দ হয় এবং এটি পরিবেশ ও মাটির জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিকরাইল ইউনিয়নের নিকরাইল, মাটিকাটা, সিরাজকান্দী, জিগাতলা এলাকায় গোবিন্দাসী ইউনিয়নে বালুঘাট রয়েছে। যমুনা নদীতে বৈদ্যুতিক টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু এবং সিরাজগঞ্জ থেকে বাল্কহেডে এনে যমুনার নদীর তীরে ২৪ ঘণ্টা চলে মোটা বালুর স্তুপ করার কাজের ফাঁকে চলে যমুনা নদী থেকে বালু উওোলনের কাজ। তবে এসব ড্রেজার থেকে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, আমাদের এখানে ২৪ ঘণ্টায় বালুর কর্মযজ্ঞ চলে। বিশেষ করে রাতের তুলনায় দিনে বেশি হয়। যার ফলে শব্দে আমরা ঠিক মত ঘুমাতে পারেনি। এর ফলে দেখা দেয় শরীরের নানা করম সমস্যা।

নাম প্রকাশে স্থানীয় এক যুবক বলেন, অনেক আগে থেকেই এখানে বালু উত্তোলন করা হয়। এতে আমরা অতিষ্ঠ। দিনরাতই চলে বালু উত্তোলন। এতে একদিনে যমুনার ভাঙনের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় সাধারণ মানুষকে। আর প্রচুর শব্দে আমাদের অনেক সমস্যা হয়। আমরা এর থেকে মুক্তি চাই।
স্থানীয় আনোয়ারা ও লাভলু বলেন, আমরা আমাদের জমিগুলো বালু রাখার জন্য লিজ হিসেবে ভাড়া দেই। এখানে সারা বছরই বালু রাখা হয়।

জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী গৌতম চন্দ্র চন্দ বলেন, যে কোন জায়গায় বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশর মারাত্মক ক্ষতি হয়। যমুনা নদীর আশপাশের বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন থেকে শুরু করে, নদীর যে গতিপদগুলো ব্যাপকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায়। একই সাথে পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বালু উত্তোলের ফলে বাড়ি ঘর বিলীনের পাশাপাশি মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ড্রেজার মেশিং মারাত্মক শব্দ দূষণ হয়। শব্দের জন্য মানুষের কানে কম শুনাসহ নানান সমস্যা হয়। ড্রেজার মেশিং এর মবিলের কারণে জীববৈচিত্রও নষ্ট হয়ে যায়। নদীর যে মাছ রয়েছে তা নষ্ট হয়ে যায়।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুজাউদ্দিন তালুকদার বলেন, বসত বিটা কিংবা মানুষের মধ্যে যদি দীর্ঘ মেয়াদী শব্দ হয় তাহলে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে পারে। ওই এলাকায় যে সমস্ত মানুষ থাকে, তাদের কানে দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতি হতে পারে। ক্ষতি হওয়ার ফলে তাদের শ্রবন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে ওই এলাকার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কারও যদি উচ্চ রক্ত চাপ থাকে তাহলে হাই হয়ে যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ যারা রয়েছেন তাদের স্টোক ও হার্ট এটাক হতে পারে। গর্ভবতী নারী থাকলে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাচ্চাদের পড়াশুনার মনোযোগ নষ্ট হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, উন্নত দেশে শব্দ দূষক বেড়া রয়েছে। কিন্ত আমাদের এখানে নেই। যতি বাতাসে বালুর ধূলি কনা প্রবেশ করে তাহলে চোখের এলার্জি, চুলকানি, শ^াসকষ্টসহ নানা সমস্যা হতে পারে।

এবিষয়ে সিরাজগঞ্জের ছাত্তার কমিশনারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বলেন, আমরা মূলত বালুর ব্যবসা করি। সিরাজগঞ্জ থেকে বালু কিনে ব্যবসা করি। আমরা কোন বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নই।

এ ব্যাপারে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাহবুব হাসান বলেন, বালু মহলের সাথে প্রশাসক মেনেজমেন্ট জড়িত নয়। আমরা সব সময়ই আইন অনুযায়ী বিধি ব্যবস্থা করে আসছি।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসান বলেন, উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর নিদের্শনা দেয়া হয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলনে করা হলে কঠোর ভাবে ব্যবস্থা নিবে।

পড়ুন: হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা, প্রকাশ করলেন মানচিত্র

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন