মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকদ্রব্যের গতানুগতিক সরবরাহ ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদক সংশ্লিষ্ট নিত্যনতুন ঝুঁকি পর্যালোচনা করে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নিয়মিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট মাদক তৈরির কাজে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের অবৈধ ব্যবহার ও অননুমোদিত সরবরাহ প্রতিরোধে নজরদারি শুরু করে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা দল সম্প্রতি সাইবার পেট্রোলিং পরিচালনা করার সময় অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের খুচরা বিক্রয় সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়।
সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, ই-কেম নামীয় একটি প্রতিষ্ঠান তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং অর্ডার গ্রহণ করছে।
তথ্যটি আরও যাচাই করতে গিয়ে এবং পূর্ববর্তী একটি মামলার তদন্তের সূত্র ধরে দেখা যায়, খোলাবাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল সংগ্রহ করে অবৈধ মাদক তৈরির প্রস্তুতি নেওয়ার সম্ভাব্য কার্যক্রমের সঙ্গে এসব নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ কারণে বিষয়টি নিছক অনলাইনে কেমিক্যাল ক্রয়-বিক্রয় নয়, বরং কোন ধরনের রাসায়নিক, কীভাবে বিক্রি হচ্ছে, ক্রেতার পরিচয় ও অনুমোদন কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং এসব রাসায়নিক কোথায় ব্যবহার হতে পারে – এসব বিষয়কে সামনে রেখে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করা হয়। তাতে দেখা যায়, মাদক তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ Controlled Chemical সাধারণ অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতিতে সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ই-কেমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড অর্ডার করা হয়, যা মরফিন থেকে হেরোইন উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
অর্ডার গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে Controlled Chemical ক্রয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স বা ব্যবহারের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত কোনো নথি চাওয়া হয়নি। অর্ডার গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে পণ্যটি ঢাকার নিকেতন এলাকায় পৌঁছালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা দল সেখানে অভিযান পরিচালনা করে।
গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গুলশান থানাধীন নিকেতন এলাকায় ই-কেমের সরবরাহকৃত পার্সেল থেকে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড এবং ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়।
ডেলিভারিম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, ই-কেমের কার্যালয় কুড়িল প্রগতি সরণী এলাকায় অবস্থিত। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা দল পরবর্তীতে ওই কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে।
সেখানে প্রতিষ্ঠানের আইটি ম্যানেজার মোঃ আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে আটক করা হয়। তার প্রতিষ্ঠানে অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ ও কোনরূপ যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে আরও কিছু নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কাগজপত্র জব্দ করা হয়।
অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ জব্দ করা হয় এবং মোঃ আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছে।
প্রিকারসর কেমিক্যাল মূলত এমন রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোর বৈধ শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহার রয়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো অবৈধ মাদকদ্রব্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২-এর উপধারা (১৯) অনুযায়ী, প্রিকারসর কেমিক্যাল বলতে এমন রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়েছে, যা ক অথবা খ শ্রেণির কোনো মাদকদ্রব্য উৎপাদন অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান অথবা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই আইনের তফসিলের ক শ্রেণির ৮ নম্বর ক্রমিকে প্রিকারসর কেমিক্যালের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই রাসায়নিকগুলোর বৈধ ব্যবহার থাকলেও অবৈধ মাদক উৎপাদনে ব্যবহারের কারণে এগুলোর সরবরাহ ও ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবেও কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। বৈধ শিল্পকারখানা ও গবেষণাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক তৈরির কাজে চলে না যায়, সে জন্য সরবরাহের উৎস, ক্রেতা, পরিমাণ এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথাযথ নজরদারি রয়েছে। বিশেষ করে এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড হেরোইন তৈরির প্রক্রিয়ায় এবং পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কোকেন তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে এসিটোন, ইথাইল ইথার, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, মিথাইল ইথাইল কিটোন ও টলুইনের মতো রাসায়নিকও অবৈধ মাদক উৎপাদনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে।
এ কারণেই এসব রাসায়নিককে কেবল সাধারণ রাসায়নিক পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই রাসায়নিক বৈধ শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হতে পারে, আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অবৈধ মাদক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হতে পারে।
প্রিকারসর কেমিক্যাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবৈধ মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বৈধ বাণিজ্যিক উৎস থেকে বিচ্যুতি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবস্থা রয়েছে। জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রিকারসর কেমিক্যালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহের ওপর নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বৈধ সাপ্লাই চেইনের আড়ালে এসব রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক মাদক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার না করা যায়।
বাংলাদেশেও একই উদ্দেশ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় প্রিকারসর কেমিক্যালকে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব রাসায়নিকের বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদের দায়িত্ব শুধু রাসায়নিক বিক্রি করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্রেতার বৈধতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন জব্দকৃত রাসায়নিক, উদ্ধারকৃত নথিপত্র এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্মে এসব রাসায়নিকের উৎস, সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য ব্যবহার শনাক্ত করার বিষয়ে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম শুধু তৈরি মাদক উদ্ধার বা মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাদক তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, কীভাবে সংগ্রহ হচ্ছে এবং বৈধ বাজারের কোন পথ ব্যবহার করে এসব রাসায়নিক অবৈধ কাজে চলে যাচ্ছে—সেই উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শনাক্ত করাও মাদক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সাইবার পেট্রোলিং এর মাধ্যমে অনলাইনে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন পর্যবেক্ষণ এখন মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ অপরাধীরা যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক বিক্রয় ও সরবরাহের নতুন পদ্ধতি তৈরি করছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও সেভাবেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সর্বশেষ সংশোধনী অনুসারে প্রযুক্তি নির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সাইবার মনিটরিং আরও জোরদার করছে।
পড়ুন : পাকিস্তানের হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৫ নবজাতকের মৃত্যু
সা/


