২০২৬ সালের ৭ আগস্ট। মক্কার আল-সাফা প্রাসাদ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যৌথভাবে সই করলেন ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে। ঘোষণা মাত্র কয়েকটা বাক্যের, কিন্তু অর্থটা সুদূরপ্রসারী। তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসন এখন থেকে গণ্য হবে তিনজনের বিরুদ্ধেই আগ্রাসন হিসেবে, অনেকটা ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর প্রতিধ্বনি।
আরব বিশ্বে এই ধরনের অঙ্গীকার অবশ্য নতুন কিছু নয়, বরং এর একটা লম্বা ও হতাশাজনক ইতিহাস আছে। ১৯৫০ সালে কায়রোয় স্বাক্ষরিত আরব লীগের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও প্রায় হুবহু একই ভাষা ছিল। বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি বেশিদূর যায়নি, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে আরব বাহিনীগুলো একসঙ্গে দাঁড়াতে পারেনি, ১৯৭৬ সালে লেবাননে পাঠানো ‘আরব ডিটারেন্ট ফোর্স’ নামে যৌথ হলেও বাস্তবে প্রায় পুরোটাই ছিল সিরীয় সেনা, আর ২০১৫ সালে ঘোষিত যৌথ আরব বাহিনী সৌদি অনীহায় কয়েক মাসেই থমকে যায়। ঘোষণার জাঁকজমক, বাস্তবায়নে নীরবতা, এই প্যাটার্নই যেন আরব বিশ্বের যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগের গা-সওয়া অভ্যাস। মক্কা চুক্তি সেই শৃঙ্খল ভাঙতে চাইছে বলেই মনে হয়, তবে সে প্রমাণ মিলবে বাস্তবায়নের পথে, ঘোষণার দিনে নয়।
চুক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল আরও এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, যখন সৌদি আরব ও পাকিস্তান রিয়াদে দ্বিপক্ষীয় ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্কেরও নিজস্ব শিকড় আছে, রণতরী বিনিময় থেকে ২০২৩ সালে তুর্কি ড্রোন কেনার সৌদি সিদ্ধান্ত পর্যন্ত। এই তিন সুতো একসঙ্গে বোনা হলো ঠিক তখন, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ সৌদি ভূখণ্ডে বারবার হামলা ডেকে এনেছে আর ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা-ছাতা কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই সংশয় রিয়াদের মনে চূড়ান্তভাবে গেঁথে দিয়েছে।
তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা কম নয়, গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক বলছে যৌথ সক্রিয় সেনাসংখ্যা প্রায় চৌদ্দ লাখ, প্রতিরক্ষা বাজেট মিলিয়ে প্রায় ১২৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসল গল্পটা সংখ্যার পেছনে, কে কী নিয়ে আসছে তাতে। সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থ ও জ্বালানি-নিরাপত্তা, তুরস্ক দিচ্ছে ন্যাটো-মানের সামরিক কাঠামো ও অস্ত্র-শিল্প, পাকিস্তান দিচ্ছে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তির মনস্তাত্ত্বিক ওজন। তবে ত্রিভুজের ভেতরের কাঠামো ভঙ্গুর। তিন দেশের হুমকি-উপলব্ধি ভিন্ন কক্ষপথে ঘোরে, রিয়াদের দুশ্চিন্তা ইরান, আঙ্কারার দুশ্চিন্তা ইসরায়েল-বিরোধিতা জোরদার করা (২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর যা আরও প্রকট), আর ইসলামাবাদের একমাত্র সামরিক ভরকেন্দ্র ভারত। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিজেই স্বীকার করেছেন, চুক্তিতে কোনো অভিন্ন শত্রু লিখিতভাবে নেই। এটা দুর্বলতা নয়, বরং সচেতন ‘নিরোধমূলক অস্পষ্টতা’, যা বাস্তব সংঘবদ্ধতার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টিতে বেশি কার্যকর।
একটা ভুল ধারণা এখানে ভেঙে দেওয়া দরকার। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র এখন সৌদি আরব বা তুরস্কের মাথার ওপরও ছাতা মেলে ধরল, এমনটা ভাবার কারণ নেই। পর্যবেক্ষকরা স্পষ্ট করেছেন, এই সম্ভাবনা কম। বরং ভাগাভাগিটা বাস্তবসম্মত: সৌদি টাকা দেবে, তুরস্ক প্রযুক্তি, পাকিস্তান জনবল। পারমাণবিক প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবক হিসেবেই, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়।
এই টেবিলে সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি মিশর। ২০২৬ সালের মার্চে রিয়াদ সম্মেলনে চার দেশের কাঠামো নিয়ে কথা হলেও তা এগোয়নি, আগস্টের অনুষ্ঠানে কায়রো ছিল অনুপস্থিত। তুরস্ক অবশ্য স্পষ্ট করেছে, জোট তিনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, মিশরকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ বলেই দেখা হচ্ছে। তবু মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়, এই চুক্তি আসলে কতটা যৌথ প্রতিরক্ষা, আর কতটা কূটনৈতিক প্রতীক? আক্রমণের মুখে ঠিক কী মাত্রার সহায়তা মিলবে, তা এখনও অনির্ধারিত, তিন রাষ্ট্র শুধু ‘পরামর্শের মাধ্যমে’ তা ঠিক করবে। ন্যাটোর পেছনে যে ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড কাঠামো ও যৌথ মহড়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, মক্কা চুক্তির পেছনে তেমন কিছু এখনও নেই। আর তুরস্ক নিজেই যেহেতু ন্যাটোর সদস্য, ভবিষ্যতে জোট-বাধ্যবাধকতা সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ানোর প্রশ্নও অমীমাংসিত।
এই জোটের ঢেউ লাগছে বৈশ্বিক হিসাব-নিকাশেও। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহ্যগত মার্কিন-নির্ভরতা থেকে সরে আসার এর চেয়ে স্পষ্ট সংকেত এখনও দেখা যায়নি, ইরান-যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ছাতা যতটা রক্ষা দেবে ভাবা হয়েছিল, ততটা দেয়নি। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সমীকরণও এই চুক্তি একরকম প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে অনেকে মনে করেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে পুরোনো আপসকামিতা যে আর আগের মতো টিকছে না, তারই ইঙ্গিত এটি। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন স্নায়ুচাপ, চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতে জল্পনা ছড়ায় যে দিল্লি জরুরি ভিত্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টা চুক্তি করতে চাইছে, ভারত সরকার তা খারিজ করলেও ঠিক আগের দিন মোদি-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ নেহাত কাকতালীয় মনে হয়নি অনেকের চোখে। আর গোটা সমীকরণ থেকে সবচেয়ে লাভবান চীন ও রাশিয়া, মার্কিন প্রভাবের এই ক্ষয় বেইজিং-মস্কোর কৌশলগত স্বার্থের একেবারে অনুকূলে যায়।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এমন মেরুকরণের যুগে আবেগনির্ভর জোটবদ্ধতা বিলাসিতা, ঝুঁকি নয়। মক্কা চুক্তিতে পূর্ণ যোগদান মানে অজান্তেই মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাতের ভাগীদার হয়ে যাওয়া, তার বদলে পর্যবেক্ষক বা সীমিত অংশীদার হিসেবে যৌথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো নির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নিরাপদ। ভারতের সঙ্গেও বাস্তববাদী অবস্থান দরকার, বাংলাদেশ কোনো ভারতবিরোধী ব্লকের অংশ নয় এই বার্তা স্পষ্ট রেখেই পানি বণ্টন বা সীমান্ত বাণিজ্যে ঢাকার নিজস্ব শর্তে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা যায়। সৌদি জ্বালানি, তুর্কি প্রতিরক্ষা-শিল্প, চীন-রাশিয়ার বিনিয়োগ, সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি পশ্চিমা বাজার ও জাপানি বিনিয়োগ অক্ষুণ্ণ রাখার সতর্কতাও জরুরি।
তবে সবচেয়ে অবহেলিত প্রশ্নটা প্রাতিষ্ঠানিক। বৈদেশিক নীতি যদি প্রতিবার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়, তাহলে যত ভালো কৌশলই সাজানো হোক তা টিকবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলনিরপেক্ষ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি-মূল্যায়ন ইউনিট, সংসদীয় কমিটিতে নিয়মিত ব্রিফিং, আর প্রধান দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম নিরাপত্তা কনসেনসাসের একটা অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম, এই তিনটি থাকলেই সরকার বদলের সঙ্গে বৈদেশিক নীতির অভিমুখ পুরো ঘুরে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
মক্কা চুক্তি দ্বিতীয় ন্যাটো নয়, এটা একটা কৌশলগত বীমা পলিসি, যার কাজ যুদ্ধ ঠেকানো, যুদ্ধ করা নয়। এর প্রতীকী শক্তি সত্যিকারের, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও কাগজে-কলমেই বেশি। আমার মূল্যায়ন, আগামী দুই-তিন বছরে এই চুক্তি হয় প্রকৃত জোটে বদলাবে, নয়তো ১৯৭৬ বা ২০১৫ সালের মতোই থমকে থাকবে নিছক রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে। আসল পরীক্ষা হবে সেই সন্ধিক্ষণে, আজকের ঘোষণায় নয়।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা তাই স্পষ্ট, এই মুহূর্তে পক্ষ বেছে নেওয়ার তাড়াহুড়ো বিপজ্জনক, কারণ চুক্তিটা নিজেই এখনও তার চূড়ান্ত রূপ খুঁজছে। রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তা-ঝুঁকি বহিরাগত আগ্রাসনে নেই, লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতায়, জলবায়ু পরিবর্তনে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনে। স্বাধীনতাকে কোনো জোটের ছায়ায় বন্ধক না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আর দূরদর্শী কূটনীতি দিয়েই বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থের সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা পেতে পারে। ধীরে চলাটা এখানে দুর্বলতা নয়, এটাই আসল প্রজ্ঞা।
লেখক : এম.এইচ. রাশেদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
পড়ুন : দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা: বাংলাদেশকে কি চাপের মুখে রাখা হচ্ছে?


