সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের বাবুলিদহ গ্রামের প্রায় ৫শ জন ভিক্ষাবৃত্তির করার কারণে গ্রামের নাম বদলে হয়েছে ফকিরপাড়া।
উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুলিদহ গ্রাম। একসময় যে গ্রাম ছিলো নিছক একটি জনপদ, সময়ের সাথে ভিক্ষাবৃত্তির কারণে স্থানীয়দের কাছে তার পরিচয় দাঁড়িয়েছে ‘ফকির পাড়া’। আর সেই বাস্তবতাই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে একটি গ্রামের পরিচয়। সরকারি কাগজ-কলমে গ্রামের নাম বাবুলিদহ, অথচ মানুষের মুখে মুখে সেটিই এখন পরিচিত ‘ফকির পাড়া’ নামে। বাবুলিদহ গ্রামে গিয়ে ভিক্ষুক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে উঠে আসে এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনের গল্প।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে মনতার সরদার নামের এক লোক এই গ্রামে রাস্তার সাথে সরকারি জায়গায় এসে বাড়ি করেন। তিনি অসুস্থতার কারণে কাজকর্ম করতে না পারায়, বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তি। তিনি মারা যাওয়া পর থেকে তার ছেলে, মেয়ে স্ত্রী ও ছেলের বৌও এখন গ্রামের গ্রামের ভিক্ষা বৃত্তি করে জীবন-যাপন করছে। শুধু তারা নয়, এই গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ বসবাস করলেও প্রায় ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের জীবন-যাপন করছে।
ভিক্ষুক নুরনবী সরদার (৪৫) বলেন, বাপ করেছে, বর্তমানে আমি ভিক্ষা করি। বাপের পথেই হাঁটছি। কথাগুলো বলার সময় চোখে মুখে ছিল জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ। ভিক্ষা যেন তার কাছে কোনো পেশার নাম নয়, বরং বংশপরম্পরায় পাওয়া এক বাস্তবতা। শারীরিক অসুস্থ্যতা আর বয়সের ভারে এখন অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, নেই কোন জমি, নেই কোন বাড়ি, সরকারি জায়গায় বসবাস করছি। কোন কর্ম নেই, এই কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করি। ভ্যান-রিক্সা চালনোর সুযোগ থাকলেও রাস্তা-ঘাট না থাকায় এই পেশা বেছে নিয়েছে। এই গ্রামের শুধু আমি না, আমাদের পরিবারে আমার মা, স্ত্রী, বোনও এই পেশা বেছে নিয়েছি। আমাদের গ্রামে প্রায় ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ এই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করে জীবন-যাপন করে চলছি। সরকারীভাবে কোন সাহায্য-সহযোগিতা পেলে অবশ্যই এই পেশা থেকে দুরে শরে স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো। শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, আর্থিক অনটনও ঘিরে ধরেছে তাকে। এখন ভিক্ষা করে সংসার চলে তার।
মৃত মনতার সরদারের মেয়ে ভিক্ষক আলফা বেগম (৪০) বলেন, “বাপ ভিক্ষা করেছে, এখন আমিও ভিক্ষা করি। সংসার চালানোর আর কোনো উপায় নেই।” স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে মহা বিপদে আছি। ছেলে মেয়েদের মুখে এক মুট খাবার তুলে দেওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে। লজ্জা আর অপমানে মুখ লুকাতে নিজ এলাকা ছেড়ে দূরে গিয়ে ভিক্ষা করি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: জিলিম উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পাতেন, কেউ আবার দূর-দূরান্তে ছুটে যান মানুষের দ্বারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পথে হাঁটতে হাঁটতে ভিক্ষাবৃত্তি যেন অনেকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, রাস্তাঘাট না থাকায় এদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। কোন কাজ না জানাই তারা ভিক্ষাবৃত্তি কাজ বেছে নিয়েছে। তাই এরা গ্রামের ছোট-বড় সবাই ভিক্ষা করে। এই কারণে ইউনিয়নের সবাই এই গ্রামটিকে ফকিরপাড়া বলে চেনেন। এই গ্রামে নেই কোন ভালো স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ। শুধু একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তাও আবার ঠিকমত ছাত্র-ছাত্রী হয় না। স্কুল কলেজ দুরে হওয়ায় ছেলে-মেয়েরা হেটে হেটে, স্কুলে যেতে চায় না। যার কারণে এই গ্রামের শিক্ষার হার কম।
স্থানীয়দের দাবি কারও হাতে কাজ নেই, কারও নেই স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। অভাবের তাড়নায় কেউ একসময় মানুষের কাছে হাত পেতেছেন। সেই হাত ধরেই পরের প্রজন্মও বড় হয়েছে। এভাবেই ধীরে ধীরে ভিক্ষাবৃত্তি ছড়িয়ে পড়েছে পরিবার থেকে পরিবারে।
বাইরের মানুষজন এই এলাকায় এলে ‘ফকির পাড়া’ নামে জায়গাটিকে চিনতে পারেন। অনেকের কাছে নামটি হয়তো হাস্যরসের বিষয়, কিন্তু এই নামের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, শুধু ভিক্ষা নয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বদলে যেতে পারে এই জনপদের মানুষের জীবন। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ, কর্মসংস্থান কিংবা ছোট ব্যবসার সুযোগ পেলে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন। বাবুলিদহের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে, একটি গ্রামের পরিচয় কি চিরকাল তার মানুষের অভাব দিয়ে লেখা থাকবে? নাকি একদিন ‘ফকির পাড়া’ নামটি শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকবে, আর বাবুলীদহ পরিচিত হবে মানুষের কর্ম, স্বপ্ন আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে? সময়ই হয়তো সেই উত্তর দেবে।
কিন্তু বাবুলিদহের মানুষের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুযোগ। যে মানুষ মাছ ধরতে পারেন, তাকে মাছ ধরার উপকরণ দিতে হবে। যে নারী কাজ করতে পারেন, তাকে আয় করার পথ করে দিতে হবে। তরুণদের দিতে হবে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান। আর যারা সত্যিই অক্ষম, তাদের নিতে হবে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায়।
কারণ ভিক্ষা হয়তো আজকের ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু আগামী দিনের নিশ্চয়তা দেয় না। বাবুলিদহের কাঁচা পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় জীর্ণ ঘর, ভাঙা চাল, পুরোনো টিন। কোথাও বৃদ্ধা বসে আছেন, কোথাও শিশুর চোখে ভবিষ্যতের অজানা কৌতূহল। অভাব তাদের অনেক স্বপ্ন মুছে দিয়েছে। কিন্তু সব স্বপ্ন এখনও মরে যায়নি।
বাবুলিদহের মানুষ ভিক্ষুক হওয়ার আগে মানুষ। তাদেরও আত্মসম্মান আছে, স্বপ্ন আছে, ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা আছে। তাই এই গল্পের শেষ পরিচয় ‘ফকিরপাড়া’ হতে পারে না। একদিন যদি এই গ্রামে পাকা রাস্তা হয়, কাজের সুযোগ আসে, তরুণরা প্রশিক্ষণ পায়, অসহায় পরিবারগুলো যথাযথ সরকারি সহায়তা পায় তাহলে হয়তো মানুষের মুখেও ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া নামটি। বাবুলিদহ।
সেদিন হয়তো কেউ আর বলবে না‘ওটা ফকিরপাড়া।’ বলবে, ওটা সেই বাবলীদহ যে গ্রাম একদিন অভাবের কাছে হেরে গিয়েছিল, কিন্তু পরে কাজ, স্বপ্ন আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছিল। আর মনিরের প্রশ্নের উত্তরও হয়তো সেদিন মিলবে। গরিব হয়ে জন্ম নেওয়া ভুল নয়, সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেঁচে থাকাটাই অন্যায়।
সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। বাবুলিদহের বাসিন্দারা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
পড়ুন:দুখু মিয়ার ৫০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ইমি/


