নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা প্রবল পানির স্রোতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। দেড় হাজার মানুষে এখও নিখোঁজে রয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের পর লেন্দে খোলা নদীর ওপর থাকা বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে জমে থাকা পানি ও বরফের বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয় এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
প্রচণ্ড পানির তোড়ে নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে সংযোগকারী সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পর বহু স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে শতাধিক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার পর্যটক ও শ্রমিকদেরও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয় বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। লেন্দে নদীর উজানে মাটি ও বরফের বড় অংশ এখনো আটকে রয়েছে। সেগুলো আবার ধসে পড়লে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে নেপালের নদীগুলো ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বিহার ও উত্তর প্রদেশেও আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে থাকায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
কীভাবে ঘটতে পারে এই বন্যা?
দুর্যোগের আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। ছবিতে দেখা যায়, আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ এখন বাদামি রঙের ধ্বংসাবশেষ ও কাদায় ঢেকে গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বলেন, “হিমবাহের সামনের অংশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভেঙে পড়েছিল—এটি নিশ্চিত। এর সঙ্গে সম্ভবত বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা যুক্ত হয়েছিল বা ধসের সঙ্গে সেগুলোও নেমে এসেছিল।”
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট ছবিতে বড় ধরনের হিমবাহ ধসের ইঙ্গিত পেয়েছেন।
তার মতে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে থাকতে পারে।
শুগার বলেন, “উপত্যকার কিছু হিমবাহকে গতকাল তুষারে ঢাকা দেখা গেছে, আর আজ সেগুলো মূলত খালি বরফে পরিণত হয়েছে। অন্যভাবে বললে—যদিও আমি এখনো কোনো আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য দেখিনি—সম্ভবত আবহাওয়া উষ্ণ ছিল।”
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে শুগার জানান, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকার মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
তবে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি ওই এলাকায় নির্মাণকাজও ধসের ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
শুগার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এতে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিঃসন্দেহে আমরা অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।”
শুধু বন্যা নয়, নামছে ধসও
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার পাহাড়ি জেলা রাসুওয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। হিমবাহ ধসের সঙ্গে সৃষ্ট বন্যায় এসব অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়েছে।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)।
সংস্থাটি বুধবার জানিয়েছে, এবারের আকস্মিক বন্যায় পানি, পলি ও বড় বড় পাথরের শক্তিশালী স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর মধ্য দিয়ে নেমে গেছে।
নদীর ভাটিতে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৯ মিটার বা প্রায় ৩০ ফুট বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এ ঘটনা কেন এত ভয়াবহ?
হিমবাহের বরফের সঙ্গে পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে এলে এর ধ্বংসক্ষমতা সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। পাহাড়ি ঢালে উচ্চতা থেকে দ্রুত নেমে আসা এমন স্রোত পথের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে বা চাপা দিয়ে দিতে পারে।
নেপালের এবারের ঘটনায় স্যাটেলাইট ছবিতে ধসের বিস্তৃত চিহ্ন দেখা গেলেও ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও পলি একসঙ্গে নিচে নেমে এলো, তা নিয়ে অনুসন্ধান এখনো চলছে।
পড়ুন: রংপুরে চার হত্যা: ২ আসামির ডিএনএ সংগ্রহ ও ডোপ টেস্ট হবে
আর/


