লটারিতে পাওয়া কাজ অন্যকে দিয়ে দেয়া, কৌশলে নিজস্ব সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের কাজ দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বরিশাল গণপূর্ত অফিসের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ মতাদর্শের প্রকৌশলী এবং ঠিকাদাররাই এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে এই অফিসটি বলে অভিযোগ সাধারণ ঠিকাদারদের।
ঠিকাদাররা বলছে, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের মুজিব কোর্ট এবং নৌকার ব্যাচ লাগানো ছবি ভাইরাল হওয়ার পরেও রহস্যজনক কারণে দাপটের সাথে চাকুরি করছেন তিনি। এমনকি জুলাই হত্যা মামলার আসামির তালিকায় রয়েছে তার নাম। কৌশলে নিজস্ব সিন্ডিকেটের লোকজনকে বড় কাজগুলো পাওয়ার ব্যাবস্থা করে দেন তিনি। সদর ৫ আসনের এমপি এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক গণঅভ্যুত্থানের পর এখনো আওয়ামী মতাদর্শের নির্বাহী প্রকৌশলীর এই অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে পুলিশ মুখ খুলছে না মামলার বিষয়ে।
বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মাহফুজ জানান, গত ১৭ আগস্ট বরিশাল তার সাথে গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে বাকবিতণ্ডার একটি সিসি ফুটেজ ভাইরাল হয়। ভিডিওটি নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই তার লোকজন দিয়ে ভাইরাল করান। নির্বাহী প্রকৌশলী চেয়েছিলেন তাকে সামাজিকভাবে হেও প্রতিপন্ন করতে।
মাহফুজ অভিযোগ করে জানান, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ লাখ টাকার এলটিএম অন্তর্ভুক্ত ১২৫৭৬৪০ আইডি নাম্বারের কাজটি লটারিতে পায় তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স মুস্তাকিম বিল্ডার্স। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলি সেই কাজ আগেই তার মনোনীত সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ইনানের ঘনিষ্ঠজন জর্ডান রোডের সিফাতকে দিয়ে আংশিক করিয়ে রাখায় মুস্তাকিম বিল্ডার্সকে ওয়ার্ক অর্ডার দেন নি। এমনকি কাজ সম্পাদনের সন্তোষজনক সার্টিফিকেট ও দিয়ে দেন অই সিফাতকে। যেখানে সাব এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার সহ এইচডির সাক্ষর রয়েছে।
একই রকম অভিযোগ ২০২৫ সালের মে মাসের ১১০৫২০৩ নাম্বার আইডির লাটারির ক্ষেত্রেও। শেবাচিমের রিপেয়ারিংয়ের কাজ পায় জেড আর এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু তা ডিসকোয়ালিফাই দেখিয়ে এম এস খান এন্টারপ্রাইজকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় দেয় গণপূর্ত অফিস।
এদিকে গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদার রিপন, কয়েস, সরকারি বরিশাল কলেজের সাবেক ভিপি শাহীন সহ সাধারণ ঠিকাদাররা জানান, সম্প্রতি পাঁচটি মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার, দুদক ভবন, আনসার অফিস, উজিরপুর থানা নির্মান, বিটেক সহ বড় অংকের কাজগুলো তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের নানা কৌশলে পাইয়ে দেন। তার সাথে মূল সহায়ক এসও জাকারিয়া। এক্সিএনের পাসওয়ার্ড ও জাকারিয়ার কাছে আছে। জাকারিয়ার মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করে। এভুলেশন ঠিক মত করে না। স্টিমিটার যা করার কথা তা জাকারিয়া করেন। আমি যে লাইসেন্স এনেছিলাম সৌরভ এন্টারপ্রাইজের সেই লাইসেন্সকেও জাকারিয়া ফোন করে বলে যে, লাইসেন্স আমি নিয়ন্ত্রণ করবো আপনার ওয়ার্ক সার্টিফিকেট দরকার, আমি দেব। তারা ট্রান্সফার হয় আবার ফিরে আসে এই জায়গায় বড় খাওন। বড় বড় টেন্ডারের কাজ। টেন্ডার পাশ করার একটা কমিটি থাকে ৫ জনের। তারা যাচাই বাছাই করার পর তারা সেন্ড করে যে ওকে ওকে সি এস পাশ। এ ছাড়া যাকে কাজ যাকে দেবে তাকে রেট কোড মিলিয়ে দেয়। নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম আমির হোসেন আমুর পাল্লক পোলা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ঝালকাঠিতে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন গণপূর্ত অফিস। পরে বরিশালে এসে কাশি মিজান, ঝালকাঠির খান্ড বিল্ডার্স এর নাসির খান, বরিশালের ছোট মাহফুজ সহ কয়েকজন আওয়ামী লীগের ঠিকাদারকেই এখনো তারা সব কাজ দেয়। সিন্ডিকেটের মূল নায়ক মিজান ওরফে কাসি মিজান। তিনি ঢাকার ক্যাসিনো সম্রাট জিকে শামিমের লোক ছিলেন। কাশি মিজানের কাছে অন্তত ছয়টি লাইসেন্সের পাসওয়ার্ড রয়েছে। একটা কাজের বিপরীতে ছয়টা লাইসেন্স দেয়। জাকারিয়া ক্যান্সার এবং কিডনি হাসপাতালের দায়িত্বে থাকার কারণে তার সাথে কাশী মিজানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জাকারিয়ায় মূলত রেট করে দেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর সকল অফিস আদালতে আওয়ামী লীগের লোকজন ওএসডি হলেও ফয়সাল কি করে বহাল তবিয়তে থাকে তাভখুবই রহস্যজনক। তাকে বিএনপি এবং স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদলের কয়েকজন নেতা শেল্টার দেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই বিভাগের একজন প্রতিমন্ত্রীর রেফারেন্স দিয়ে হুমকি ধামকি দেন মাঝে মধ্যে।
এদিকে আওয়ামী সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করেন ঠিকাদাররা। খান বিল্ডার্স এর নাসির খান জানান, আমরা লোয়েস্ট দিয়ে কাজ পাই আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। আর বাইরে কিছু না।
অন্যদিকে ছাত্র জনতার উপর পরোক্ষ হামলার মামলায় আসামী এই নির্বাহী প্রকৌশলির বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানিয়েছে মামলার বাদী মোঃ জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি একজন জুলাই যোদ্ধা। নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম ছাত্রজনতার উপর হামলার নেপথ্য নায়ক। তিনি আর্থিক সহায়তা করেছেন আওয়ামী লীগকে। তার অফিস ছিল আওয়ামী লীগের আস্তানা। তিনি সহ মামলার অন্যান্য আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করে না।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান। তিনি ছাড়াও আরো কারা কারা জড়িত সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এস বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বলেন, নৌকার ব্যাচ সহ মুজিব কোর্ট পরা ছবি এডিট করা। রেট কোড অনেক অফিসেই আছে তিনি কেন দিবেন। অন্য কেউ তো দিতে পারে। সাব এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার জাকারিয়াকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান নির্বাহী প্রকৌশলী ছাড়া কারো বক্তব্য দেয়ার নিয়ম নেই।
বরিশাল সদর আসনের এমপি এডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার জানান, আওয়ামী লীগের লোকজন এখনো বিভিন্ন অফিস আদালতে ছড়িয়ে আছে। এরা এখনো আওয়ামী লীগের তাবেদারি করছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমার কাছে রিপোর্ট এসেছে আমি এখনো আমলে নিই নি তবে খতিয়ে দেখবো। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জানান, টেন্ডারে সিস্টেমগত পরিবর্তন হওয়া দরকার। গেল ১৭ বছর আমাদের ছেলেরা তো বাসায় ঘুমাতে পারিনি টেন্ডারে অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা। সুতরাং তাদের অভিজ্ঞতা আসবে কোথা থেকে।
তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলি মোক্তার দেওয়ান (মূল দায়িত্ব গোপালগঞ্জ ভারপ্রাপ্ত বরিশাল জোন) জানান, মোবাইল ফোনে সব কিছু স্পষ্ট বোঝা যায় না। আপনি যা বলেছেন যদি সে অনুযায়ী কিছু ঘটে থাকে আমি বরিশাল এসে বসবো এবং বিষয়গুলো দেখবো। খতিয়ে দেখে ব্যাবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।
পড়ুন: গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘিরে হাহাকার, লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগ
আর/


