গাইবান্ধায় কয়েক দফায় নদী ভাঙনে শতাধিক ঘরবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কয়েকশো ঘরবাড়ি। বিশেষ করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তার কড়াল গ্রাসে গত ৭২ ঘন্টায় তিস্তা নদীর আকস্মিক ভাঙনের তীব্রতায় নদীতে নিমিশেই বিলীন হয়ে গেছে ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা। এর মধ্যে ১২টি পরিবারের অন্তত সাতটি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে গেছে এবং কয়েকটি ঘরের আংশিক অংশ ডুবে গেছে নদীতে। ইতিমধ্য নদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি।
সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করে গত বুধবার সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখি বিদ্যালয়ের উত্তরপাশে ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের তীব্রতা এতোটাই ছিলো যে ওই রাতে নিমিশেই এখানকার ৬০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়। বসতভিটা বিলীন হওয়া পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ১২টি পরিবারের ৭টি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে যায়। এ সময় ভাঙনের তোড়ে কিছু পরিবারের ঘরবাড়ি আংশিক ভেঙে নদীতে পড়ে। এ সময় তাদের গাছ-গাছালি ও হাঁস-মুরগির ঘরসহ হাঁস-মুরগিও নদীতে পড়ে নদীতে বিলীন হওয়া গাছ-গাছালি এবং খড়কুটোতে আশ্রয় নেয়।এছাড়াও ওই এলাকায় ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। এসব পরিবারে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, নদীতে পানি কিছুটা বাড়ছে কিন্তু তার আগে পানির পরিমাণ অনেকটা কমের প্রভাবে এই ভাঙন তীব্র হচ্ছে।
ভাঙনের কবলে পড়া ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলমান বর্ষা মৌসুমে কয়েক দফায় এই এলাকাটি ভাঙনের কবলে পড়ে। অন্তত চার দফা তীব্র ভাঙনের সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট নদীতে বিলীন হয় এখানকার চরের শিশুদের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর আগে গত ১৬ জুলাই দুপুরে সেখানে আকস্মিক ভাঙন দেখা দেয়। ওইদিনও অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ১০০ এর কাছাকাছি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের এসব খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এমনকি গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বিদ্যালয়টিসহ ভাঙন এলাকার বসতিদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
তাদের অভিযোগ, পরিমাণ মতো জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এমন ভাঙন দেখতে হতো না তাদের। পাউবোর কাছে বারবার অনুরোধ জানালেও তারা কোনো কর্ণপাত করেনি।
সরেজমিন,ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। রান্না বা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ কেউ উঁচু বাঁধ ও স্বজনের আঙিনায় অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন; জরুরি ভিত্তিতে তাদের জন্য তাঁবু ও শুকনা খাবার প্রয়োজন।
অন্যদিকে জেলার চরাঞ্চলের নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে করে প্রতিনিয়ত তাদের বাড়ি ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাতে হচ্ছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লার চরের বাসিন্দা হায়দার আলী বলেন, চরে সারা বছরই নদী ভাঙ্গে। চরের সামনে অনেকের বাপ- দাদার বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সবাই শুধু ভাঙন রোধে আশ্বাস দেয়। কেউ কাজ করে না।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম কান্না কন্ঠে বলেন, ‘এখন কোথায় জাইয়া ঠাঁই নিমু! ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ি নিল রাক্ষসী তিস্তা। দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গাত কোনোমতে মাথা গুঁজে আছনু। সেটাও আজ চলি গেল। হ্যামার ঘরে দুঃখ দেখার মতো কেউ নাই। চোখের সামনত ঘর দুইটা নদীত চলি গেল, কিছুই করবার পানু না।’
এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আতোয়ার রহমান বলেন, ‘যখন বাড়িঘর ভাতে শুরু করে, তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে। ভাঙন থামলে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর ধরে এই অবহেলা চলছে, অথচ স্থায়ী কোনো প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই।’
কাপাশিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম বলেন, এই এলাকায় বর্ষার শুরু থেকই ভাঙন চলছে। গত বুধবার রাত ৩টার দিকে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। নিমিশেই ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা এমনকি তাদের খোঁয়াড়সহ হাঁস-মুরগিও নদীতে ভেসে গেছে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ভাঙনের মুখে আরও দুই শতাধিক পরিবার রয়েছে। ভাঙন রোধে পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে হবে। পানি উন্নয়নবোর্ড কাজ শুরু করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন , ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন কবলিতদের মাঝে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছে পাউবো। তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা করা হলে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ওই এলাকায় ভাঙনের খবর পেয়েই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যাক জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে।
এ সময় স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশ্নে এই প্রকৌশলী বলেন, এসব জরুরি কাজ। জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে তো কাজের অনুমতি পাওয়া যায় না। যখন ভাঙন ধরে, তখন কাজের অনুমতি পেয়ে কাজ করা হয়।
পড়ুন : ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেত্রকোনার অর্ক: বুলেটের দাগই যার সাহসের প্রতীক


