সংসদে তর্ক হবে, বিতর্ক হবে – এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই বিতর্কে যখন যুক্তির চেয়ে খুনসুটি বেশি, নীতির চেয়ে ব্যক্তিগত বাক্যবাণ বেশি, তখন প্রশ্ন ওঠে – এই ‘বিনোদন’-এর দাম কত? কারণ হিসাব বলছে, জাতীয় সংসদ পরিচালনার প্রতি মিনিটের গড় অর্থমূল্য প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। অর্থাৎ এক ঘণ্টা সংসদ চললে খরচ প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর ছয় ঘণ্টা চললে – প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা!
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশন বিশ্লেষণ করে পাওয়া গড় হিসাবে দেখা গেছে সংসদ পরিচালনার প্রতি মিনিটে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। এখন চলছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন। এই ব্যয় বেড়েছে বৈ, কমেনি- এটা বলাই যায়।
এই ব্যয়ের মধ্যে আছে সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক ও ভাতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভবন ও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ-পানি, নিরাপত্তা, প্রশাসনিকসহ নানা পরিচালন ব্যয়। অর্থাৎ সংসদের মাইক্রোফোন অন হলেই শুধু শব্দ বের হয় না – চালু হয় জনগণের টাকার মিটারও!
কিন্তু সেই মাইক্রোফোনে কী বলা হচ্ছে? সেটিই এখন প্রশ্ন। কারণ সংসদে কখনো কখনো আইন, বাজেট, অর্থনীতি কিংবা জনজীবনের সংকটের বদলে জমে ওঠে ব্যক্তিগত খোঁচা, রাজনৈতিক কটাক্ষ আর কথার লড়াই। সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের বাহাস।
সাম্প্রতিক অধিবেশনগুলোতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও সংসদের আলোচনায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি কখনো শোনা যাচ্ছে উর্দু শের। কখনো কবিতার পংক্তি। কখনও হিন্দি সংলাপ।
আওয়ামী লীগের আমলে সংসদে গান শোনা যেতো, কবিতাও শোনা যেতো। এখন পর্যন্ত সংসদে অন্তত গান শোনা যায়নি। কারণ সংসদে শিল্পীসমাজের প্রতিনিধি নেই। তবে কবিতা আছে। আছে শের। আছে পংক্তি। আর আছে কথার ছন্দে পাল্টা ছন্দ।
বাংলাদেশের সিনেমা হলে দর্শক নেই বললেই চলে, গানের বাজার সীমিত, কনসার্ট নিয়ে নানা বিধিনিষেধ, নাটক চলে ওটিটির পর্দায় – তখন জাতীয় সংসদ যেন হয়ে উঠেছে নতুন এক ‘লাইভ শো’! শুধু সমস্যা একটাই – এই শোর টিকিট কাটতে না হলেও জনগনের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সাধারণ আলোচনাই হয়েছে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এতে অংশ নিয়েছেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য। প্রতি মিনিটে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকার পুরোনো গড় হিসাব ধরে এই সময়ের আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা বলে একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এখানে অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে – সংসদে আলোচনা হলেই তো টাকা অপচয় নয়। বরং সংসদে যত বেশি আলোচনা হবে, ততই তো গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার কথা। অবশ্যই। কিন্তু আলোচনা যদি হয় জনগণের সমস্যা নিয়ে, আইন প্রণয়ন নিয়ে, অর্থনীতির সংকট, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি কিংবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে – তাহলে সেই প্রতিটি মিনিটের মূল্য আছে।
কিন্তু যদি মূল্যবান সেই মিনিট চলে যায় একে অপরকে নিয়ে দোয়া দুরুদ পড়ে, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, দলীয় বাহাস কিংবা এমন বিতর্কে যার সঙ্গে জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্কই নেই – তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতো বিপুল অংকের খরচের বিনিময়ে জনগণ আসলে কী পেল?
টিআইবির হিসাব আরও একটি অস্বস্তিকর ছবি দেখিয়েছিল। একাদশ সংসদের ২২টি অধিবেশনে কোরাম সংকটেই নষ্ট হয়েছে ৫৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। সেই সময়ের আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কখনো সংসদে কথা বলার মানুষ নেই, আবার কখনো কথা থামছেই না! তবে খরচ কিন্তু একই থাকছে।
চলতি বছরেই বিরোধী দল একাধিকবার ওয়াকআউট করেছে। ওয়াকআউট গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের স্বীকৃত পদ্ধতি। কিন্তু সেই প্রতিবাদেরও একটি মূল্য আছে। কারণ সংসদ থেকে কেউ বেরিয়ে গেলে খরচ কিন্তু কমে যায় না। সবাই মুখে বলছে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কথা। সংসদে প্রতিবাদের বদলে যাওয়া কোন পথ কী বের করা যায় না?
গণতন্ত্রের জন্য বিতর্ক দরকার। বিরোধিতা দরকার। সরকারকে প্রশ্ন করা দরকার। প্রয়োজনে তীব্র ভাষায় সমালোচনাও দরকার। ব্যক্তিগত কটাক্ষ, ব্যাঙ্গাত্মক খোচা আর বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা করা কতটুকু যৌক্তিক? এমন প্রশ্নই উঠছে সচেতন মহল থেকে।
পড়ুন : সংসদে আরও পাঁচটি স্থায়ী কমিটি গঠন
ভিডিও দেখুন : https://www.youtube.com/watch?v=fEdBjmrCaAk


