রাজশাহীর উপশহর সেক্টর-২ এ অবস্থিত ‘সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান রাইসা (৮) স্কুলে সহপাঠীদের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর শনিবারে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় তার বাম হাত ভেঙে যায়। এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ি করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ অভিভাবকরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, স্কুল ছুটির পর খেলার সময় অন্য শিক্ষার্থীদের ধাক্কায় রাইসা মাটিতে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার বাম হাত ভেঙে যায়। ঘটনার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবককে ফোন করে জানায় যে তাদের মেয়ে খেলতে গিয়ে পড়ে গেছে। খবর পেয়ে রাইসার মা আতঙ্কিত অবস্থায় ছুটে স্কুলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তাতে যে কারো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। কোনো প্রকার প্রাথমিক চিকিৎসা বা চিকিৎসকের ব্যবস্থা না করেই যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা শিশুটিকে একটি বেঞ্চে ফেলে রাখা হয়েছিল; কেবল মাথায় দেওয়া হয়েছিল কিছুটা পানি। ঝুলন্ত ও বাঁকা ভাঙা হাত নিয়ে মেয়েকে অমানবিক যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে মা ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পরবর্তীতে শিশুটির বাবা ও পরিবারের সদস্যরা এসে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ভাঙা হাত প্লাস্টার করে দিলে সন্ধ্যায় তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, এই পুরো বিপদের সময়ে কিংবা পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিশুটির কোনো ধরনের খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। এমনকি পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার ও অসংবেদনশীল আচরণ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে সরজমিনে স্কুলে গিয়ে অনুসন্ধানে মেলে চাঞ্চল্যকর চিত্র। জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ফার্স্ট এইড বক্সে তুলার মতো অতিপ্রয়োজনীয় কোনো উপাদানও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফার্স্ট এইড বক্সে প্রয়োজনীয় উপাদানের এমন ঘাটতির কথা স্বীকার করে সৃষ্টি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জনাব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “প্রাথমিক চিকিৎসা বক্সে এসব না থাকা নিশ্চিতভাবেই গাফিলতি ও অপরাধ। তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। বাচ্চারা খেলতে গিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে।”
স্কুলের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওস্তাদ হাসিব পান্না বলেন, “সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হলো, চরম যন্ত্রণায় বাচ্চাটা দীর্ঘক্ষণ ওই স্কুলে পড়েছিল। এটি আমাকে ভীষণভাবে চিন্তিত করেছে। বাবা-মা নিশ্চিন্ত মনে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে থাকেন। এমন বিপদে স্কুল কর্তৃপক্ষই শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারত, অথচ বাবা-মা এসে হাসপাতালে নিয়ে গেল ! যাদের বাবা-মা দ্রুত আসতে পারবে না, তাদের বাচ্চার কী পরিণতি হতো ? বিষয়টি শিক্ষাবোর্ড ও সরকারের গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখা দরকার। এভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।”
অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত ভয়াবহ ঝুঁকি ও নিরাপত্তার করুণ চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সামান্য খেলার জন্য ন্যূনতম কোনো মাঠ নেই। স্কুলের প্রধান ফটকের সামনের রুমটির এক পাশে অভিভাবকদের বসার স্থান এবং অন্য পাশে মোটরসাইকেল ও সাইকেল পার্কিং করে রাখা হয়। মাঝের সংকীর্ণ যাতায়াতের পথ দিয়েই প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে চলাচল করে। মাঠ ও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা না থাকা এবং নিরাপত্তার ঘাটতি থাকায় প্রতিনিয়ত এমন মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার রোজি খন্দকার বলেন, “অভিভাবকরা লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব। সবেমাত্র এই বেসরকারি স্কুলগুলোকে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে, সামনে এদের দেখভাল ও তদারকির দায়িত্ব সরাসরি আমরাই পালন করব।”
একটি নামীদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন প্রশাসনিক অব্যবস্থা, ফার্স্ট এইড সুবিধার অনুপস্থিতি এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়। অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবক মহল।
পড়ুন : কালিয়াকৈরে মাদক ও দেশীয় অস্ত্রসহ ৬ জন আটক


