সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা পেতে ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বরের কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে আজ মঙ্গলবার থেকে চালু হচ্ছে অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এভিএস)। এর আওতায় সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় গ্রাহকের দেওয়া ব্যাংক হিসাব নম্বর টাকা পাঠানোর আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে এ ব্যবস্থা চালু করছে। অর্থ বিভাগের ‘স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি (এসপিএফএমএস)’ কর্মসূচির আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরকারের ১১টি জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মধ্যে ৯টির লেনদেন বর্তমানে ন্যাশনাল সেভিংস স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এনএসসি সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় নিবন্ধিত একক গ্রাহকের সংখ্যা বর্তমানে ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ২২৪ জন।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে গ্রাহকদের মুনাফা ও মূল অর্থ পরিশোধ করা হয়। একই সময়ে গড়ে প্রায় ৮ হাজার নতুন সঞ্চয়পত্র ইস্যু হয়।
জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু রয়েছে। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের সুবিধা।
এতদিন সঞ্চয়পত্র কেনার সময় গ্রাহক যে ব্যাংক হিসাব নম্বর দিতেন, সেটিই সরাসরি সিস্টেমে যুক্ত করা হতো। হিসাব নম্বরের কোনো একটি সংখ্যা ভুল হলেও ইএফটি ফেরত আসত। পরে তথ্য সংশোধন করে পুনরায় টাকা পাঠাতে হতো। এতে গ্রাহকের ভোগান্তির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজও বেড়ে যেত। একই সঙ্গে ভুল হিসাব নম্বরের কারণে একজনের প্রাপ্য অর্থ অন্যের হিসাবে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও ছিল।
নতুন এভিএস ব্যবস্থায় ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়ার পরই বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে তা যাচাই করা হবে। প্রথমে হিসাবটি সঠিক ও সচল কি না, সেটি পরীক্ষা করা হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নম্বরের সঙ্গে হিসাবধারীর তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
এর ফলে টাকা পাঠানোর আগেই ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাংক হিসাব শনাক্ত করা সম্ভব হবে। শুধু নতুন সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় নয়, পরবর্তী সময়ে ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন বা সংশোধনের ক্ষেত্রেও এভিএস ব্যবহার করা হবে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর জানিয়েছে, এভিএস চালু হলে ভুল হিসাব নম্বরের কারণে ইএফটি ফেরত আসার ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি গ্রাহকের ভোগান্তি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অতিরিক্ত কাজও কমবে। এর ফলে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ নিরাপদে ও নির্ভুলভাবে প্রকৃত হিসাবধারীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো সহজ হবে।
অর্থ বিভাগের মতে, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ডিজিটাল সেবা আধুনিকায়নে এভিএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সঞ্চয়পত্রের লেনদেন আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের অর্থ দ্রুত ও সঠিক সময়ে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানো সহজ হবে।
এভিএস এর সুবিধাগুলো হলো:
অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (Account Verification System) হলো একটি স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল ব্যবস্থা, যা মূলত কোনো গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিমেষেই যাচাই করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
ভুল অ্যাকাউন্ট নম্বর শনাক্তকরণ: গ্রাহক টাকা তোলার বা জমা দেওয়ার সময় ভুল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিলে সিস্টেমটি তা সাথে সাথে ধরে ফেলে। ফলে টাকা অন্য কোথাও চলে যাওয়ার বা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
নিরাপদ ও নির্ভুল লেনদেন: লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার আগেই গ্রাহকের দেওয়া তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টের রেকর্ডের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা হয়। এতে প্রতিটি লেনদেনের নিরাপত্তা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত হয়।
সময় অপচয় রোধ: আগে ভুল অ্যাকাউন্টের কারণে টাকা স্থানান্তরে অনেক দেরি হতো বা প্রক্রিয়াটি আটকে থাকত। এভিএস চালুর ফলে খুব দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাব যাচাই হয়ে যায়।
প্রতারণা বা জালিয়াতি রোধ: ডিজিটাল মাধ্যমে অন্যের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জালিয়াতি করার সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।
গ্রাহক সেবার আধুনিকীকরণ: এটি একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক ব্যবস্থা, যা গ্রাহকদের কোনো ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত সেবা পেতে সাহায্য করে।
কাজের চাপ ও ঝামেলা হ্রাস: লেনদেন ভুল না হওয়ার কারণে ইস্যু অফিস, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত কাজের চাপ ও জটিলতা অনেক কমে গেছে।
ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন বা সংশোধনের সুবিধা: সঞ্চয়পত্র কেনার পর কোনো গ্রাহক যদি তার ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন বা সংশোধন করতে চান, তবে নতুন হিসাব নম্বরটিও একইভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে নেওয়া সম্ভব।
দ্রুত সেবা ও নির্ভুল লেনদেন: যেহেতু তথ্য সাথে সাথে যাচাই হয়ে যায়, তাই প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ লেনদেনে ভুলের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।এর ফলে গ্রাহকের প্রাপ্য টাকা কোনো রকম দেরি ছাড়া অনেক দ্রুত তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিল যাচাই: ব্যাংক হিসাব নম্বরের পাশাপাশি গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্ট নম্বরের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।এর ফলে প্রকৃত হিসাবধারী বা সঠিক ব্যক্তিই টাকা পাচ্ছেন কি না, তা সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
তাৎক্ষণিক তথ্য যাচাই: (Real-time Verification)নতুন সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় গ্রাহকের দেওয়া ব্যাংক হিসাব নম্বরটি সঠিক এবং সচল (Active) কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়।
পড়ুন : ইউপি নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে কিছুই জানে না সরকার: শাহে আলম
সা/


