ভারতের গুজরাট থেকে ৩৫০ টনের বেশি ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি করেছে ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। তবে দেশের বিভিন্ন বাজারে এসব মাছ বাংলাদেশের ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আমদানি করা মাছের প্রকৃত উৎস গোপন করে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি করায় ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
আমদানিকারক, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং বা সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভারত থেকে আরও ইলিশ বাংলাদেশে আসছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসা ইলিশের বেশিরভাগই ভারতের গুজরাট রাজ্য থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ পাঠানো নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। পদ্মার ইলিশ পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বদলে পশ্চিমবঙ্গ হয়েই বাংলাদেশে আসছে বিপুল পরিমাণ গুজরাটের ইলিশ। পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তপথে এসব মাছ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। তার দাবি, রপ্তানি হওয়া এই ইলিশের প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে এসেছে।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত দেশের বাজারে ইলিশের যে দাম, তার তুলনায় ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের দাম কয়েক গুণ কম পড়ে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানিতে আগ্রহী হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে ইলিশের চাহিদা থাকলেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ইলিশের দাম তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে গুজরাট থেকে আমদানি করা ইলিশ কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কম মূল্যে মাছ সংগ্রহ করে বাজারজাত করার সুযোগ থাকায় কিছু ব্যবসায়ী আমদানির দিকে ঝুঁকেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে আমদানি করা মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্রেতারা মাছের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে জানতে পারছেন না। আমদানি করা ইলিশকে দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হলে বাজারে পণ্যের পরিচয় ও দামের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ভারত থেকে আরও ইলিশ আসার তথ্যও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানির কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে মোট কত পরিমাণ মাছ দেশে আসবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তর থেকে যথাযথ অনুমতি নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন এসব মাছ আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই বলে জানান তিনি।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির কিছু অনুমতি দিয়েছেন।
এদিকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হলেও এ বছর বাণিজ্যের চিত্রে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে গুজরাট থেকে ইলিশ বাংলাদেশে আসছে, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ আমদানির অনুমতি চাইছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদার পেছনে শুধু স্বাদ নয়, দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতিও কাজ করছে। দুর্গাপূজার সময় পদ্মার ইলিশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। এ কারণে পূজার আগে বাংলাদেশি ইলিশ আমদানির অনুমতি পেতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে গুজরাটের ইলিশের চাহিদার অন্যতম কারণ মাছের ডিম। ব্যবসায়ীরা এসব মাছ থেকে ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করছেন। পরে সেগুলো বিদেশের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ফলে ইলিশকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের একটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। বাংলাদেশের বাজারে কম দামের গুজরাটের ইলিশ প্রবেশ করছে, আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা চাইছেন বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ। একই মাছকে ঘিরে দুই দেশের বাজারে চাহিদার এই পার্থক্য ইলিশ বাণিজ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
পড়ুন: জুলাই হত্যাযজ্ঞের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
আর/


