ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন করে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থসংকটের কারণে গাজার ২০টির বেশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে বলে জানিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ তথ্য জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো যে অল্প পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছে, তা দিয়েই কোনোভাবে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হচ্ছে। এই অবস্থায় ডিজেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুনির আল-বুরশ বলেন, গাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজন ডিজেল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই বন্ধ হবে না, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রমও একে একে অচল হয়ে পড়তে পারে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ডিজেল সরবরাহ বন্ধ হলে হাসপাতালের জেনারেটরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অপারেশন থিয়েটার এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউয়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হবে।
হাসপাতালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র, অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে।
বিশেষ করে ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতক, ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল রোগী, যুদ্ধ ও সংঘাতে আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আল-বুরশ।
গাজায় বিপুলসংখ্যক রোগী ও আহত মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভরশীল। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ইতোমধ্যেই নানা সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
ডিজেল সংকটের প্রভাব শুধু হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসাসেবাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে জানিয়েছেন মুনির আল-বুরশ। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে আহত ও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে এসব যানবাহন চালানো সম্ভব হবে না। ফলে জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থাও জ্বালানি সংকটে অচল হয়ে পড়তে পারে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হলে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় ওষুধ ও টিকা সংরক্ষণ করা কঠিন হবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে
মুনির আল-বুরশ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাময়িক জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। তাঁর দাবি, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ক্রমাগত সংকটের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোকে কার্যক্রম বন্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হাসপাতালগুলো পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এমন অনেক মৃত্যুও ঘটতে পারে, যেগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। বিশেষ করে জরুরি অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা, ডায়ালাইসিস, নবজাতকের চিকিৎসা এবং আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত হলে রোগীদের জীবন রক্ষার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালগুলো যে সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করছে, তার ওপরই বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্ভরশীল। তাই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুনির আল-বুরশ। তিনি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং গাজার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম থেকে শুরু করে জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই দাবির বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ঠিক কীভাবে এবং কোন কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ, জরুরি চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অক্সিজেন ব্যবস্থা, নবজাতকের চিকিৎসা এবং ওষুধ সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গাজার সংকটাপন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নতুন করে আরও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পড়ুন:মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, যা বলছে তুরস্ক
ইমি/


