মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য ৪০ হাজার ভারী বোমাসহ ২৮০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করতে যাচ্ছে। এতে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের এমকে৮৪ বোমাসহ উচ্চমাত্রায় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম ৪০ হাজার বোমা রয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
এপি জানিয়েছে, এখনো চূড়ান্ত না হওয়া এই অস্ত্র প্যাকেজে ৪০ হাজার বোমা রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ২০ হাজার এমকে৮৪ বোমা রয়েছে। এগুলো উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক বোমা।
এছাড়া রয়েছে আরও ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা, যেগুলোও উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক এবং মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে। এসব বোমা এমনভাবে তৈরি, যাতে আকাশ থেকে ফেলা হলে বাতাসের বাধা কম পায় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
এছাড়া এসব বোমার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু বোমা মাটির গভীরে থাকা ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি। আবার কিছু বোমা মাটির ওপর বিস্ফোরিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। চুক্তির বেশিরভাগ অর্থ বিদেশি সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
এ ব্যবস্থায় মার্কিন করদাতাদের অর্থ ইসরায়েলকে দেয়া হয় এবং পরে ইসরায়েল সেই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই অস্ত্র কেনে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘সব বিদেশি অস্ত্র বিক্রয়ই যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে’। তবে বর্তমানে আলোচনায় থাকা চুক্তিগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
কেন ইসরায়েলের প্রতি এতটা অনুগত যুক্তরাষ্ট্র?
আমেরিকার মানুষের স্বাস্থ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক বিষয় নিয়ে সংকটের শেষ নেই। অথচ এসব সমস্যা সমাধানের বদলে দেশটির সরকার প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্রেট—কোনো সরকারের অবস্থানেই উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। উভয় দলই ইসরায়েলের প্রতি সমানভাবে অনুগত। ফিলিস্তিনে গণহত্যা সমর্থনের ক্ষেত্রেও বাইডেন কিংবা ট্রাম্প কেউ পিছিয়ে নেই।
আমেরিকায় ট্রাম্প বা বাইডেনের সমালোচনা করা তুলনামূলক সহজ হলেও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করা ততটা সহজ নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রও প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সহায়তা দিয়েছে। গাজায় ব্যবহৃত বোমাগুলোর গায়ে ‘মেইড ইন ইউএসএ’ লেখা। একইভাবে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো প্রয়োজন ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে; ইসরায়েলের প্রয়োজনেই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মুসলিম দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন। এর মধ্যে কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও করে। ইসরায়েলের লক্ষ্য পারস্য সভ্যতার উত্তরসূরি এবং মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র আত্মপ্রত্যয়ী ও শক্তিশালী দেশ ইরানকে দুর্বল বা ধ্বংস করে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলের প্রতি এতটা নিবেদিত, তা বুঝতে ইতিহাস, অর্থনীতি, ধর্ম ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো দেশকে দেওয়া মার্কিন অর্থসহায়তার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। এর বড় অংশই সামরিক খাতে ব্যয় হয়। অর্থাৎ মার্কিন করদাতাদের দেওয়া অর্থ সরাসরি ইসরায়েলের সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত হয়।
বাৎসরিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারকে দৈনিক হিসাবে ধরলে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার ইসরায়েলে যাচ্ছে। এই অর্থ দিয়ে ফাইটার জেট, বোমা, ট্যাঙ্ক এবং আয়রন ডোমের মতো মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা ও গড়ে তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অর্থ।
যুক্তরাষ্ট্রের উদারপন্থী জনগণের বড় একটি অংশ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু তাঁর আমলেই ইসরায়েলের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। ২০১৬ সালে ১০ বছরের জন্য ইসরায়েলকে ৩৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার চুক্তি হয়। এর আওতায় প্রতিবছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলার করে দেওয়া হচ্ছিল। সরকার পরিবর্তন হলেও এই সহায়তায় কোনো তারতম্য হবে না, সেটিও নিশ্চিত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ আমেরিকার মানুষের জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও ইসরায়েলের পরবর্তী যুদ্ধবিমান বা বোমা কেনার অর্থ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
তবে এই অর্থের পুরোটাই ইসরায়েলে যায় না। এর একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যায়। আইন অনুযায়ী, এই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আমেরিকার প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর পণ্য কেনায় ব্যয় হয়। লকহিড মার্টিন, বোয়িং, রেথিয়নসহ বিভিন্ন কোম্পানির অস্ত্র ইসরায়েলে যায়। ফলে ইসরায়েল পায় অস্ত্র এবং কর্পোরেশনগুলো পায় মুনাফা। আর এর বিল পরিশোধ করেন সাধারণ আমেরিকান জনগণ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়া অর্থের একটি অংশ কর্পোরেট মালিকদের পকেটে যায়, জনগণের সেবায় নয়।
ইসরায়েলের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমে ২০১১ সাল থেকে ২.৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিজ, রাস্তাঘাট কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণের বোঝায় থাকা শিক্ষার্থীদের ঋণের কিছু অংশ মওকুফ করা যেত। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ লাখ গৃহহীন মানুষের জন্যও অর্থ ব্যয় করা সম্ভব ছিল। পাশাপাশি প্রায় ১০ শতাংশ আমেরিকান স্বাস্থ্যবীমা কিংবা চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াই জীবনযাপন করছে। সেখানেও পরিবর্তন আনা যেত।
জনগণের কাছ থেকে নেওয়া করের অর্থ জনগণের উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু এর একটি বড় অংশ বিদেশে সামরিক খাতে চলে যাচ্ছে এবং গাজা-লেবাননের শিশুদের হত্যায় সেই অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার যে অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে থাকছে, তারও একটি অংশ বিলিয়নিয়ারদের কাছে যাচ্ছে; জনগণের কাছে তা সেবা হিসেবে ফিরে আসছে না।
এ কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে—মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ কেন বিপুল পরিমাণ মার্কিন করের অর্থ পাচ্ছে, যেখানে তিন কোটিরও বেশি আমেরিকানের মৌলিক চাহিদা পূরণের অর্থ নেই?
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলার দেওয়াকে কেবল দাতব্য কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একে বিনিয়োগ বলা যায়। এই বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্পেই ফিরে যায়। আর এই অর্থপ্রবাহ অব্যাহত রাখার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী লবি ও রাজনৈতিক প্রভাব। যুদ্ধের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনই এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে এইপ্যাক—আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনে এটি অন্যতম শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী লবি সংগঠন। এইপ্যাকের বার্ষিক সম্মেলনে হাজার হাজার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও অনুদান সংস্থার সদস্য অংশ নেন। দল যে পক্ষেরই হোক, আমেরিকান প্রেসিডেন্টও সেখানে হাজির হন আনুগত্য বা প্রীতি প্রদর্শনের জন্য।
এই লবি সংগঠন পছন্দের রাজনীতিবিদদের পেছনে অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি ইসরায়েলি নীতির সমালোচকদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। ডেমোক্রেট রাজনীতিবিদ মেরিল্যান্ডের ডোনা এডওয়ার্ডস এবং মিশিগানের অ্যান্ডি লেভিনের ওপর হামলা হয়েছে, কারণ তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়—এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে রাজনৈতিকভাবে শেষ হয়ে যেতে হবে।
এইপ্যাকের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংগঠন এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল এবং অ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ। এসব সংগঠন রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করে, বুদ্ধিজীবীদের নিয়োগ করে এবং ওয়াশিংটনে লবিং চালায়, যাতে কংগ্রেস ও সিনেটে ইসরায়েলের পক্ষে নীতি ও আইন প্রণয়ন বা পাস হয়।
শুধু রাজনীতিতেই নয়, মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তাদের প্রভাব রয়েছে বলে এই লেখায় দাবি করা হয়েছে। মিডল ইস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি নীতি নিয়ে আলোচনা করে, সংবাদপত্রে কলাম লেখে এবং গবেষণা প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও প্রয়োজনীয় মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।
এইপ্যাক ও অন্যান্য লবি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেছনে মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়, যাতে কংগ্রেসে ইসরায়েলের জন্য বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বরাদ্দ হয়।
আমেরিকার সব প্রেসিডেন্টই এই ব্যবস্থার অংশ। তাঁদের ভূমিকা পুরো ব্যবস্থার জেনারেল ম্যানেজারের মতো। অন্যদিকে কত ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেল, বাইডেন বা ট্রাম্প, রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট—অল্প কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া কারও তাতে কিছু যায় আসে না।
তবে অর্থ ও লবিংয়ের বাইরে আরও কিছু গভীর বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের ন্যারেটিভ। আমেরিকানদের বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। হলিউডের চলচ্চিত্র ও স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ইসরায়েলকে সাহসী একটি ছোট দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার চারদিকে শত্রুরাষ্ট্র। বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস ও অবস্থান সেভাবে তুলে ধরা হয় না। যতটুকু তুলে ধরা হয়, সেখানে তাদের চরমপন্থী বা আগ্রাসী হিসেবে দেখানো হয়।
হামাস ফিলিস্তিনের নেতৃত্বে থাকার কারণে যেন শিশুহত্যাও বৈধ হয়ে যায়—এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকার প্রায় সব প্রেসিডেন্টই বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে আছে অথবা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। বুশ, ক্লিনটন, বাইডেন কিংবা ট্রাম্প—এ বক্তব্যে তেমন পার্থক্য নেই। এই ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করা কোনো রাজনীতিবিদের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।
এর আরও গভীরে রয়েছে ধর্মীয় বিষয়। বিপুলসংখ্যক আমেরিকান ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান বিশ্বাস করেন, বাইবেলেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের টিকে থাকার কারণ বলা হয়েছে। ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েলের পাদ্রীরা প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সমর্থনের পক্ষে বক্তব্য দেন। আর এই জনগোষ্ঠীর ভোট কোনো প্রেসিডেন্টই হারাতে চান না।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের অনেকেই ইসরায়েলের হাতে নিগৃহীত হওয়ার কথা বলেন। শুধু মসজিদ নয়, চার্চেও ইসরায়েলের হামলার অভিযোগ রয়েছে। তারপরও আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক খ্রিস্টান ইসরায়েলকে সমর্থন করে যাচ্ছে এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কথা বলছে না।
ইহুদি-খ্রিস্টান নির্বিশেষে অনেকের ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের পেছনে যে ধারণাটি কাজ করে, সেটির নাম জায়নবাদ। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে ইহুদিদের ইসরায়েলে গিয়ে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা জায়নবাদ নামে পরিচিতি পায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধারণা ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণে ব্যবহৃত একটি মতাদর্শে পরিণত হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। এর গভীরে বর্ণবাদের উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। এই মতের সমর্থক শুধু ইহুদিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অনেক খ্রিস্টানও এতে বিশ্বাস করেন। জো বাইডেন নিজেকে জায়োনিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে জড়িয়েছে—ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাকসহ আরও অনেক স্থানে। এই লেখায় বলা হয়েছে, এর পেছনে সামরিক শিল্পের স্বার্থও কাজ করে। যুদ্ধ না হলে অস্ত্র বিক্রি হবে কীভাবে—এই প্রশ্নও সেখানে তোলা হয়েছে। যুদ্ধের পর পুনর্গঠন প্রকল্পেও মার্কিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পায়। ইরাকে হামলা শেষ হওয়ার পরও এমনটি ঘটেছিল।
মানবাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতি অনেকটা আড়াল করতে পারত বলেও লেখাটিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রয়োজনও নেই বলে দাবি করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউএসএইডের এসব ‘বাজে খরচ’ বন্ধ করার উদ্যোগ হিসেবে তিনি ইউএসএইড বন্ধ করে দিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন—বাইডেনের ভাষায় ‘আনওয়েভারিং সাপোর্ট’—যুক্তরাষ্ট্রকে এমনকি পরাশক্তি হিসেবেও অযোগ্য করে তুলেছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। কারণ পরাশক্তি শুধু হামলা করে না, বিশ্বমোড়ল হিসেবে কিছু দায়িত্বও পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এমন এক দেশের, যার নেতৃত্বে রয়েছেন একজন বিকারগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট এবং যে দেশটি নেতানিয়াহুর কথামতো চলে—এমন মন্তব্যও করা হয়েছে। নব্বই লাখ মানুষের একটি দেশের কথায় ৩৫ কোটি মানুষের দেশটি চলছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় ইসরায়েলপন্থী অর্ধ-ধর্ম-রাজনৈতিক চক্রটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরায়েলের হামলা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ধারাবাহিক হামলা এবং ইসরায়েলের কথামতো যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার কারণে বৈশ্বিক পর্যায়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সেখানে বলা হয়েছে।
গাজার হাসপাতাল কিংবা ইরানের স্কুলে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাসীর কাছে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। এমনকি যেসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও গাজা বা লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হিসেবে দেখা হয়েছে। ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সামনে থাকলেও ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর প্রভাবে উত্তেজিত হয়েছেন, তা বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এমন দাবি করা হয়েছে।
ট্রাম্পের কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্ট পদত্যাগের সময় টুইট করে জানিয়েছেন: “আমি আমার বিবেকের বরাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মানতে পারি না। ইরান আমাদের জন্য কোনো হুমকিই ছিল না। এটা পরিষ্কার যে, আমরা এই যুদ্ধটা করছি ইসরায়েল এবং এর শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপের কারণে।”
তবে পরিস্থিতির ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটার আগেই গাজা, লেবানন, পশ্চিম তীর ও ইরানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকা, জাতিসংঘের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও তুলে ধরা হয়েছে।
পড়ুন : ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমারই ছিল : আসিফ নজরুল
সা/


