বিজ্ঞাপন

সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষিকার মৃত্যু, মালামালসহ গ্রেপ্তার ২

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের (৫৫) মৃত্যুর ঘটনায় মোটরসাইকেলসহ দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম।

তিনি জানান, ছিনতাইকারীদের রাজধানীর একটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।

ছিনতাইকৃত মালামাল ছাড়াও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ইয়াবা টেবলেট।

এর আগে, গত ৩০ আগস্ট এ ঘটনায় শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

পুলিশ জানায়, গত ২৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ছিনতাইকারীদের হ্যাচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ হারান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। তিনি বগুড়া থেকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে আসতেই একটি মোটরসাইকেলে এসে রিকশার পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় তিনি অটোরিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। তার মাথা ফেটে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

রাজধানীতে বেপরোয়া ছিনতাই

রাজধানীতে ছিনতাই এখন আর রাতের নির্জন সড়কে সীমাবদ্ধ নেই। দিনের আলোয়, ব্যস্ত সড়কে, চলন্ত রিকশায় কিংবা যানজটে আটকে থাকা বাসেও ঘটছে ছিনতাই। কখনো মোবাইল বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কখনো ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টান কিংবা অস্ত্রের আঘাতে ঘটছে মৃত্যু ও অঙ্গহানির মতো ঘটনা।

এর আগে ১৯ মার্চ একই কৌশলের শিকার হন মুক্তা আক্তার।ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা মুক্তার ব্যাগ একটি প্রাইভেট কার থেকে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে পরে মারা যান তিনি।

১৪ ফেব্রুয়ারির পল্টন মোড়ে চলন্ত রিকশায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর কানের দুল টেনে নেওয়া হলে তার কানের লতি ছিঁড়ে যায়।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আলোচিত ঘটনা। কিন্তু মৃত্যু কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে সামনে এলেও প্রতিদিনের অনেক ছিনতাই থেকে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল, টাকা বা মানিব্যাগ নিয়ে যাওয়া কিংবা মুহূর্তের মধ্যে ফোন ছোঁ মেরে পালিয়ে যাওয়ার অনেক ঘটনাই কেবল সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়।

পুলিশি হিসাবে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি এবং ডাকাতির মামলা ১৮টি।

অন্যদিকে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪০২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো যোগ করে রাজধানীতে মোট ছিনতাইয়ের সংখ্যা বের করার সুযোগ নেই। কারণ সময়সীমা ও অপরাধের আইনি শ্রেণিবিন্যাস এক নয়। বরং পরিসংখ্যানগুলো একটি বড় সমস্যাই সামনে আনে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণের জন্য একক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

রাত-নির্জন সড়কের গণ্ডি পেরিয়েছে ছিনতাই

একসময় রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় সন্ধ্যার পর বা গভীর রাতে নির্জন সড়কে একা পথচারীকে টার্গেট করার প্রবণতাই বেশি আলোচনায় আসত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই চিত্র বদলে দিয়েছে।

২২টি গুরুতর বা আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণে মানুষকে কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে, চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে এবং অস্ত্রের মুখে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাগুলো শুধু গভীর রাতে ঘটেনি। ভোর, সকাল, দুপুর এবং ব্যস্ত সময়েও ছিনতাই হয়েছে। অর্থাৎ ছিনতাইয়ের ঝুঁকি এখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে নেই।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে দিনদুপুরে ৩৮ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ ছোটখাটো সুযোগসন্ধানী ছিনতাইয়ের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অনুসরণ করে বড় অঙ্কের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বদলেছে কৌশল

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে কয়েকটি কৌশল বারবার সামনে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি হচ্ছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, সিএনজি বা অন্য যান থেকে চলন্ত রিকশা-অটোরিকশার যাত্রীর ব্যাগ ধরে টান দেওয়া। মুক্তা আক্তার, সোহেলি ইসলাম ও রনজিলা পারভিন—তিনজনই এই ধরনের ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

আরেকটি পরিচিত কৌশল হলো দুই থেকে পাঁচজন মিলে পথচারী বা রিকশার যাত্রীকে ঘিরে ফেলা। ছুরি বা চাপাতি দেখিয়ে কিংবা আঘাত করে দ্রুত টাকা, মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এর বাইরে ব্যবসায়ী বা নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিকে আগে থেকে অনুসরণ করে সুবিধাজনক স্থানে হামলার ঘটনাও রয়েছে। ফলে সব ছিনতাইকে একই ধরনের অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; সুযোগসন্ধানী ছিনতাইয়ের পাশাপাশি পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ অপরাধের নমুনাও রয়েছে।

আলোচিত ঘটনাগুলোতে মোহাম্মদপুর–আদাবর, শেরেবাংলা নগর–ফার্মগেট, ধানমন্ডি, উত্তরা–তুরাগ, গুলিস্তান–পল্টন এবং যাত্রাবাড়ী–কদমতলী এলাকার নাম বারবার সামনে এসেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ এলাকাভিত্তিক সরকারি পরিসংখ্যান না থাকায় এগুলোকে রাজধানীর সবচেয়ে ছিনতাইপ্রবণ এলাকার ক্রমতালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যানজটে বাসের জানালায় নতুন ভয়

ছিনতাইয়ের আরেকটি দৃশ্যমান ধরন হচ্ছে যানজটে আটকে থাকা বাসের জানালা থেকে মোবাইল ছোঁ মেরে নেওয়া। বাস থেমে গেলে বা ধীরে চলার সময় জানালার পাশে বসে ফোন ব্যবহারকারী যাত্রীকে লক্ষ্য করছে ছিনতাইকারীরা।

কারওয়ান বাজার, আসাদ গেট, যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশে এ ধরনের ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। যাত্রাবাড়ী–ডেমরা এলাকার যানজটে গাড়ির জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে।

তবে কোন এলাকায় বাসের জানালা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মোবাইল ছিনতাই হয়—এমন কোনো প্রকাশ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, শ্যামলী, মিরপুর ১০, পল্লবী কিংবা অন্য কোনো এলাকাকে সংখ্যার ভিত্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যাচ্ছে না। নাগরিক জীবনে এর আতঙ্ক এখন সবখানে।

ছিনতাইয়ের ফোন কোথায় যায়

রাস্তায় মোবাইল ছিনতাইয়ের পেছনে চোরাই ফোন কেনাবেচার বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে র‍্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ১২৬টি পুরোনো মোবাইল, ১৬৫টি ডিসপ্লে, ১৬টি ট্যাবসহ বিপুল পরিমাণ মোবাইলের যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চোর ও ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে ফোন কিনতেন। পরে ট্র্যাকিং এড়াতে ফোন খুলে যন্ত্রাংশ বিক্রি করা এবং IMEI পরিবর্তনের কাজও করা হতো। ওই সময় র‍্যাবের বক্তব্য ছিল, রাজধানীতে মোবাইল চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ছিনতাই করা মোবাইল যদি সহজেই নগদ টাকায় পরিণত করা যায়, যন্ত্রাংশ হিসেবে বিক্রি করা যায় কিংবা পরিচয় বদলে আবার বাজারে ছাড়া যায়, তাহলে শুধু রাস্তা থেকে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করে পুরো অপরাধচক্র বন্ধ করা কঠিন।

তিন শতাধিক স্থান চিহ্নিত, তবু আতঙ্ক কেন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের তথ্যে রাজধানীর তিন শতাধিক স্থান ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা এসেছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকায় তুলনামূলক বেশি ছিনতাইয়ের তথ্যও তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। অর্থাৎ কোথায় ঝুঁকি রয়েছে, সে সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে, গ্রেপ্তার করে আদালতেও পাঠানো হচ্ছে।

তারপরও একের পর এক ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে, এসব অভিযান রাজধানীর রাস্তায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কতটা কমাতে পারছে। পরিচিত এলাকাগুলোতে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকায় প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রশ্নও সামনে আসছে।

ছিনতাইয়ের কৌশল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান যখন অনেকটাই চিহ্নিত, তখন শুধু নাগরিককে সতর্ক থাকার পরামর্শে এর সমাধান নেই। নিয়মিত অভিযান ও শত শত গ্রেপ্তারের পরও তাই প্রশ্ন থেকে যায়—রাজধানীর রাস্তায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোথায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন