ইউক্রেনের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুদের ওপর নজরদারি, হত্যা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অভিযুক্তরা রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্কের হয়ে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। পাঁচ অভিযুক্তই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে অভিযোগপত্রটি প্রকাশ করা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে থাকা ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর ওপর নজরদারি চালাতে নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। নজরদারির পর নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নেটওয়ার্কটির কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হত্যার পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউক্রেনের সঙ্গে মিত্রতা রয়েছে বা ইউক্রেনের মিত্র হিসেবে বিবেচিত ইউরোপীয় দেশগুলোর বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্যও সহযোগী নিয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল।
নিউইয়র্কের এফবিআই কার্যালয়ের প্রধান জেমস বার্নাকল জুনিয়র বলেন, দীর্ঘ তদন্ত ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানুষকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির এফবিআই কার্যালয়ের প্রধান ড্যারেন কক্সও তদন্তে একাধিক এফবিআই ইউনিট ও অংশীদার সংস্থার সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সম্ভাব্য সহিংস কর্মকাণ্ডের হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর তদন্তকারীরা দ্রুত ব্যবস্থা নেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, রাজধানী ওয়াশিংটনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রতিরোধে এই সমন্বিত অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই নেটওয়ার্ক অন্তত ২০২৪ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও হত্যার কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগপত্রে নেটওয়ার্কটিকে রাশিয়ার হয়ে বিদেশে গোপন অভিযান পরিচালনার বৃহত্তর কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এফবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির আগের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রুশ ভিন্নমতাবলম্বী ও দেশত্যাগী ব্যক্তিরা ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের মিত্র হিসেবে বিবেচিত দেশ এবং এসব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিকে তাদের নজর বাড়ে।
অভিযোগপত্রে যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত একটি কথিত নিয়োগ প্রচেষ্টার বিস্তারিত বিবরণও রয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এক ব্যক্তিকে একজন বিশিষ্ট রুশ ভিন্নমতাবলম্বীর ওপর নজরদারি চালানোর জন্য নিয়োগ করা হয়। ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি স্থানে পাঠানো হয়েছিল এবং কীভাবে নজরদারি করতে হবে সে বিষয়ে তাকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, নজরদারির কাজের বিনিময়ে ওই ব্যক্তিকে প্রথমে ১ হাজার ডলার এবং পরে আরও ১ হাজার ৫০০ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি কথিত লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের একজনের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তী পর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তুকে হত্যা বা ‘নিখোঁজ’ করার বিনিময়ে ৪০ হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নেটওয়ার্কের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আরও কয়েকজনকে একই ধরনের কাজে নিয়োগের চেষ্টা করেন এবং এ জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহিংসতা ও গোপন অভিযান পরিচালনা করা। তবে অভিযোগপত্রে উত্থাপিত তথ্যগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র কেবল অভিযোগের বিবরণ। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তকে আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাঁচ অভিযুক্তই বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম কীভাবে এগোবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এই ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তৎপরতা, নাশকতার অভিযোগ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কথিত গোপন অভিযান ও নাশকতার অভিযোগ নিয়ে একাধিক তদন্ত পরিচালনা করেছে।
সর্বশেষ মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিদেশি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কথিত সহিংস তৎপরতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে কথিত নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে মামলার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ হবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, প্রমাণ এবং তাদের সম্ভাব্য আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়গুলো পরবর্তী আইনি কার্যক্রমে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
পড়ুন:ইসরায়েলের সামরিক শক্তি বাড়াতে ৪০ হাজার বোমা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইমি/


