বিজ্ঞাপন

চলনবিলে নৌকায় ভ্রমণপিপাসুদের ঢল

বিজ্ঞাপন

বর্ষা এলেই যেন নতুন যৌবন ফিরে পায় সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। তার নিচে যতদূর চোখ যায় শুধু থইথই জলরাশি। পানির বুক ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে জুড়িয়ে যায় শরীর-মন। কোথাও নৌকার ছলাৎছল শব্দ, কোথাও জলের আয়নায় নীল আকাশের নিখুঁত প্রতিবিম্ব। চারপাশে সবুজের মায়াবী হাতছানি।

বর্ষার এই অপরূপ রূপ দেখতে প্রতিদিনই চলনবিলের বিভিন্ন প্রান্তে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। ছুটির দিনে সেই ভিড় রূপ নেয় দর্শনার্থীদের ঢলে। জেলার উল্লাপাড়ার উধুনিয়া ও তাড়াশের কুন্দইল সেতু এখন দূর-দূরান্তের ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম আকর্ষণ। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও বগুড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসছেন মানুষ।

বিকেল গড়াতেই জমে ওঠে বিলপাড়। কেউ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখছেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। আবার কেউ নৌকা ভাড়া করে বিলের বুকের গভীরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটিয়ে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি ভুলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চলনবিলের উধুনিয়া ও কুন্দইল এলাকায় রয়েছে নৌকার ঘাট। উধুনিয়া বাজার এবং কুন্দইল সেতু এলাকার ঘাট থেকে ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ছোট ডিঙিনৌকা। নিয়মিত যাতায়াতের নৌকাও রয়েছে। এসব নৌকা নিয়ে দর্শনার্থীরা বিলের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টায় একটি নৌকা ভাড়া করতে খরচ হয় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। পুরো দিনের জন্য নৌকা ভাড়া করলে মাঝিদের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা যায়। নৌকায় ওঠার আগেই চোখে পড়ে বর্ষার উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ পানিতে গোসল করছেন, কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পানির ধারে এসে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে আবার যানবাহনে করে মাকড়শোন এলাকায় গিয়ে সেখান থেকে নৌকায় উঠে বিলের ভেতরে ঘুরছেন।

বন্ধুদের দল কিংবা পরিবার নিয়ে পুরো নৌকা ভাড়া করে অনেকে সঙ্গে নিচ্ছেন সাউন্ড বক্স। বিলের বুকেই চলছে গান-বাজনা, নাচ আর আনন্দ-উল্লাস। ছুটির দিনে উধুনিয়া ও কুন্দইল এলাকায় তাই মানুষের উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়।

তাড়াশের চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষায় বিলে পানি এলেই তিনি মেয়েকে নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে আসেন। পানিতে নৌকা ভাসিয়ে কিছু সময় প্রকৃতির মধ্যে কাটাতে তার ভালো লাগে। কুন্দইল সেতুর ঘাটে পৌঁছালেই মনে হয়, বর্ষার উৎসব বসেছে চলনবিলে। ঘাটজুড়ে সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ব্যস্ততা আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর পুরো এলাকা।

সেতুর রেলিং থেকে কেউ পানিতে লাফিয়ে পড়ছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। আবার অনেকেই কোনো আয়োজন ছাড়াই দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন বিলের জলরাশি, দূরের সবুজ আর আকাশের সঙ্গে পানির অপূর্ব মিতালি।

স্থানীয় মাঝি আব্দুল করিম, কানাইসহ কয়েকজন বলেন, বর্ষা মৌসুমে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক যাত্রী পারাপার ও নৌকাভ্রমণ করাতে হয়। এ সময়ের বাড়তি আয়েই সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে এসেছেন ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া। তিনি বলেন, নৌকাভ্রমণ এবং চারপাশের প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে। ছোটনের মেয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাছিমা প্রথমবারের মতো চলনবিল দেখতে এসেছে। তার ভাষায়, নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে সে খুবই আনন্দিত।

চলনবিল শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদনের জায়গা নয়; বর্ষার পানি ঘিরে বদলে যায় বিলপাড়ের বহু মানুষের জীবিকার হিসাবও। নৌকা চালক আলতাব শেখ বলেন, বর্ষায় চলনবিল পানিতে ভরে উঠলে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপিপাসুরা আসেন। তারা নৌকা ভাড়া নিয়ে বিলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। এ সময় নৌকা চালিয়ে সংসার ভালোই চলে। তবে, শুকনো মৌসুমে নৌকা চালানোর তেমন কাজ থাকে না। তখন কৃষিকাজ কিংবা অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ মাস চলনবিল ভ্রমণের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। পানির পরিমাণ ভালো থাকলে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্তও দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। এবার পর্যাপ্ত পানি এবং তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়কের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ায় জমে উঠেছে বিলপাড়ের মৌসুমি ব্যবসাও। বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ভাজাপোড়া, চা, ফল ও নানা ধরনের খাবারের অস্থায়ী দোকান। কোথাও আবার গড়ে উঠেছে ভাসমান কফি হাউস ও খাবারের দোকান।

এদিকে, উল্লাপাড়ার উধুনিয়ায় পর্যটকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘জলডাঙ্গা কফি হাউজ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। বিলের পানির মধ্যে বসে চা-কফি কিংবা খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সেখানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. বকুল হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে মানুষের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় কেনাবেচাও ভালো হয়। পানি শুকিয়ে গেলে ব্যবসা কিছুটা কমে যায়। তবে সব মিলিয়ে ব্যবসা ভালোই চলছে।

উধুনিয়ার বিলাঞ্চলে শুধু নৌকাভ্রমণ নয়, যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বিনোদনের আয়োজনও। বিকেল হলেই বিভিন্ন আকারের নৌকা নিয়ে বিলের পানিতে বেরিয়ে পড়েন দর্শনার্থীরা। কোনো কোনো নৌকায় বাজে গান। গানের তালে তালে নাচ-গানে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উল্লাপাড়ার উধুনিয়ায় ঘুরতে আসা ৮ নং সলঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সহ-সম্পাদক এম. দুলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিকেলে উধুনিয়ায় এসে তার খুব ভালো লেগেছে। স্ত্রী ও নাতিরাও আনন্দ করেছেন। বিলের মাঝখানে নৌকায় গান বাজতে দেখা গেছে এবং গানের তালে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে নাচতেও দেখা গেছে।

অফিসের কাজের সূত্রে উধুনিয়ায় আসা সাংবাদিক সোহাগ হাসান জয় ও অদিত্য রাসেলও মুগ্ধ হয়েছেন বিলের পরিবেশে। কাজের ফাঁকে এমন নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো তাদের কাছেও বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

চলনবিলের পর্যটন আকর্ষণ শুধু উধুনিয়া কিংবা কুন্দইল সেতুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্ষাকালে বিলসা সেতু, উধুনিয়া, কুন্দইল এবং বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের ৯ নম্বর ব্রিজসহ বিভিন্ন এলাকাতেও দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। ছুটির দিনে এসব এলাকায় শত শত নৌকা দর্শনার্থীদের নিয়ে বিলের বুক চষে বেড়ায়।

স্থানীয় বাসিন্দা জাকারিয়া বলেন, বর্ষা এলেই চলনবিলের চেহারা বদলে যায়। প্রতিদিন বিকেলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ছুটির দিনে ভিড় আরও বেড়ে যায়। সঠিকভাবে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে পারেন।

লেখক, গবেষক ও খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, চলনবিলের এই অংশকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, চলনবিলে ভ্রমণে আসা মানুষের সুবিধার্থে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা নিয়ে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।

বর্ষার জল নামলেই চলনবিল যেন বদলে যায় এক বিশাল জলরাজ্যে। আকাশের নীল, সাদা মেঘ, সবুজ প্রকৃতি আর থইথই পানির মিতালিতে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্যপট। সেই জলরাশির বুকে নৌকার দোল, মাঝিদের ব্যস্ততা, দর্শনার্থীদের কোলাহল আর প্রকৃতির সান্নিধ্যসব মিলিয়ে প্রতি বর্ষাতেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় চলনবিল। আর এই সৌন্দর্যের টানে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষের ঢলই জানান দিচ্ছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন