রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার ১১ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
আজ (বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২-এ আজ মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আজ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ১১ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল দুইয়ে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে ট্রাইব্যুনাল পলাতক শেখ হাসিনাসহ ৩০ আসামিকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য আদেশ দিয়েছেন। গত ২৭ জুলাই ৪১ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২।
একইসঙ্গে পলাতকদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ মামলায় দুটি অভিযোগের মধ্যে প্রথমটিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা মামলায় উল্লেখ্য করা হয়েছে। এদিকে, গাজীপুরের অধ্যক্ষ আবুল হোসেনকে গুমের ঘটনায় পুলিশের সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান ও এডিসি ইশতিয়াকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি রাশেদ খান। অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ শাপলা চত্বর বিক্ষোভ ছিল ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে। রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত একটি বিক্ষোভ ও অবরোধ-কর্মসূচি যা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আহ্বানে ও নেতৃত্বে আয়োজিত হয়। বাংলাদেশে ইসলাম ও নবী অবমাননাকারীদের বিচারের দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এই বিক্ষোভ ও গণসমাবেশের ডাক দেয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের নবি মুহাম্মদ সম্পর্কে অপ্রীতিকর মন্তব্য করার শাস্তি হিসেবে একটি ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন এবং প্রকাশ্য নারী পুরুষের অবৈধ মেলামেশা ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারকে আহ্বান জানানো।
৫ মে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা শাপলা চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। বিক্ষোভ দমনের লক্ষে তৎকালীন সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী অপারেশন সিকিউর শাপলা নামে একটি অভিযান পরিচালনা করে। এরপর ৬ মে ভোরে উস্কানিমূলক আচরণের অভিযোগে সরকার বিরোধীদলীয় গোষ্ঠীর মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়, যা যৌথবাহিনীর অপারেশানের কার্যকলাপ সরাসরি সম্প্রচার করেছিল।
মতিঝিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরদিন সোমবার সকালে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ, হাটহাজারী ও বাগেরহাটসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে মিছিল হয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে অপারেশনে সংঘটিত হতাহতের সংখ্যা ও পরিস্থিতিকে বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়। অনেকগুলো সূত্র থকে ৩০ জনেরও অধিক নিহত হওয়ার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এদিকে হেফাজতে ইসলাম দাবি করে যে, তাদের হাজারেরও অধিক কর্মী আহত বা নিহত হয়েছেন, যা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকারের জুন মাসের প্রতিবেদন ও সরকারি বিবৃতিসহ কোনো মুক্ত গণমাধ্যমেই প্রকাশ করা হয়নি।
২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মোট ৬১ জন নিহত উল্লেখ করে ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ জিটিভির একটি প্রতিবেদনে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ২০১৩ সালের মে মাসের উপাত্তের সাথে তার পূর্বের ও পরবর্তী অন্যান্য মাসের গড় উপাত্তের মৃতের সংখ্যার পার্থক্যের বরাতের ভিত্তিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩০ জন উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালে ৪ মে শাপলা চত্বরে একটি মহাসমাবেশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ৯৩ জন শহীদের তথ্য প্রকাশ করে।
পড়ুন : সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষিকার মৃত্যু, মালামালসহ গ্রেপ্তার ২
সা/


