রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় দুই বাসের চাপায় তাসফিয়া আহমেদ তিশা (৩১) নামে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষিকা নিহত হয়েছেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ৯টার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত তাসফিয়া আহমেদ তিশা চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রফেসর পাড়ার মো. শফিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে। তিনি খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ার নয়াপাড়ায় থাকতেন এবং আফতাবনগরের মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় তাসফিয়া তিশা মোটরসাইকেলযোগে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে এক সহকর্মীর বাসায় যাচ্ছিলেন। এসময় বিপরীত দিক থেকে আসা রমজান পরিবহনের একটি দ্রুতগতির বাস মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় তিনি মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলে সারা পরিবহনের অপর একটি বাসের চাকা তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে তার মাথা থেঁতলে গিয়ে তিনি মারাত্মক আহত হন।
খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনয় চন্দ্র পাল জানান, ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর জানান। তথ্য পাওয়ার পরপরই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
তিনি আরও জানান, স্থানীয়রা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ফরাজী হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। রাত পৌনে ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনার পর ঘাতক বাস দুটি আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে একটি বাসের চালক ও অপর বাসের হেলপারকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
রাজধানীতে বেশি ঝুঁকিতে পথচারী-মোটরসাইকেল আরোহী
দিন যত যাচ্ছে, রাজধানীর সড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন সাধারণ পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা। বিশেষজ্ঞরা রাজধানীর পাঁচটি ব্যস্ত এলাকাকে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষ চালক, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, ফুটপাত দখলসহ নানা কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজধানী ঢাকা নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে অন্যতম সড়ক দুর্ঘটনা। নগরীর বিভিন্ন সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যাও।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে রাজধানীর সড়কে সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছেন সাধারণ পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা। নিহতদের মধ্যে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ পথচারী এবং ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ মোটরসাইকেল আরোহী। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ বাস, রিকশা ও অটোরিকশার চালক এবং যাত্রী। প্রতিবছরই দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ক—এই পাঁচটি ব্যস্ত এলাকাকে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘নানা ধরনের যানবাহন চলছে একই শহরে। ফলে এইখানে পথচারী পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে চলে গেছে। রোডস এন্ড হাইওয়ে বলেন কিংবা বিআরটিএ বলেন–এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসলে প্রতিষ্ঠানিক কার্যকারীতা নেই, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অনেক ঘাটতি আছে, এগুলো প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলো নিয়ে আসলে কোনো উদ্দোগ নেওয়া হচ্ছে না। সরকার তো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।’
রাজধানীর যানবাহন ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক, যানজট, অটোরিকশার দৌরাত্ম্য এবং ফুটপাত দখলসহ বেশ কিছু কারণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতির সমাধানে প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘ঢাকা শহরে যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে অধিকাংশই পথচারী কেন্দ্রিক দুর্ঘটনা। লোকেশন ভিত্তিক যদি বলি তাহলে ইনটারসেকশে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ঢাকা শহরে যতগুলো ইনটারসেকশ রয়েছে সবগুলোর একটা বিজ্ঞানভিত্তিক একটা গবেষণা প্রয়োজন। কোথায় কতটুকু সেফটি মেজার নিলে পথচারীরা নিরাপদে থাকবে সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনগুলোর তুলনায় রাজধানীর সড়কে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।
ছয় বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১,৩৮৪ জনের
২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জনের প্রাণ গেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৪৮৮ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, নিহতদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৪ জন, নারী ২১৯ জন এবং শিশু ১৩১ জন।
নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। পথচারী নিহত হয়েছেন ৫৯২ জন এবং মোটরসাইকেল আরোহী ৫৩৬ জন। এ ছাড়া বাস, রিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রী নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ভোরে ১৪২ জন (১০.২৬%), সকালে ২৫৮ জন (১৮.৬৪%), দুপুরে ১৯৫ জন (১৪.০৮%), বিকালে ১৭৪ জন (১২.৫৭%), সন্ধ্যায় ৯৬ জন (৬.৯৩%) এবং রাতে ৫১৯ জন (৩৭.৫%) দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
রাজধানীতে দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের হিসাবেও বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের অংশ রয়েছে। এর মধ্যে বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ট্রাক-কভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্যাংকার-ময়লাবাহী ট্রাক ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-জিপ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং অটোরিকশা-সিএনজি-লেগুনা ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, রাতে ও সকালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি। বাইপাস রোড না থাকায় রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর সড়কে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এতে রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীরা বেশি নিহত হচ্ছেন।
দীর্ঘসময় যানজটের কারণেও যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তাদের মূল্যায়নে, এটিও সড়ক দুর্ঘটনার একটি ‘কারণ’ হিসেবে কাজ করছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় সড়ক অপ্রতুল। একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের পাশাপাশি স্বল্প ও দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করছে। এর সঙ্গে ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, যথাস্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করা বা সেগুলো ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটছে।
সংস্থাটি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ককে দুর্ঘটনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস-সার্ভিস চালুর পরামর্শ দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
এ ছাড়া বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা জরুরি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
পড়ুন : বৃষ্টিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত, এশিয়ান গেমসের সেমিতে বাংলাদেশ
সা/


