ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার পর মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরকে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের সফরের বাকি অংশ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান। তবে বিতর্কের মধ্যে শিরান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর নয়। সফরের আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানস্থলের মালিকদের সিদ্ধান্তেই এই পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিতর্কের পর ২৪ ঘণ্টায় ইনস্টাগ্রামে শিরানের অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখের বেশি কমেছে। ফোলহা ডি সাও পাওলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিতর্কের আগে শিরানের অনুসারী ছিল প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ; পরে তা কমে প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখে নেমে আসে।
ঘটনার সূত্রপাত ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে সেখানে মঞ্চে ওঠেন ম্যাকলমোর। অনুষ্ঠানে তিনি গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের মানুষের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের কথা ভুলে যাওয়া হয়নি। এরপর তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেন এবং তাঁর প্রতিবাদী গান ‘হিন্দস হল’ পরিবেশন করেন। ৫ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানেও তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
দ্বিতীয় দিনের বক্তব্যে ম্যাকলমোর ইসরায়েলের সমালোচনা ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনকে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষের সঙ্গে এক করে না দেখার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের পর ইসরায়েলপন্থী সংগঠন ইসরায়েলি-আমেরিকান কাউন্সিল ম্যাকলমোরকে শিরানের সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে একটি আবেদন শুরু করে।
এরপর সফরের পরবর্তী কয়েকটি অনুষ্ঠানস্থলের মালিকপক্ষ ম্যাকলমোরকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আপত্তি জানায়। সফরের প্রচারক প্রতিষ্ঠান মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ম্যাকলমোরকে রাখা হলে কয়েকটি অনুষ্ঠানস্থল শো আয়োজন না করার অবস্থান নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে শিরানের সফরের বাকি অংশ থেকে ম্যাকলমোরকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ম্যাকলমোরের দাবি, অনুষ্ঠানস্থলের মালিকদের চাপের কারণেই তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটের নামও সামনে আনেন তিনি। পরে ক্রাফট ম্যাকলমোরকে গিলেট স্টেডিয়ামে পরিবেশনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে নিজের ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেন। তাঁর বক্তব্য, ম্যাকলমোরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অতীতে তাঁর কিছু বক্তব্য ও প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি আঘাতের আশঙ্কা ছিল। তবে ক্রাফট একই সঙ্গে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তি ও দুর্ভোগের অবসানের পক্ষে থাকার কথা বলেন।
বিতর্কের মধ্যে ১৫ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বিবৃতি দেন শিরান। তিনি বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কারণে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং উভয় পক্ষের মানুষের suffering বা দুর্ভোগকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেন। তাঁর ভাষ্য, ম্যাকলমোর গত বছর তাঁর সফরে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং তিনি তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অন্য সহযোগী শিল্পীদের মতো ম্যাকলমোরকেও নিজের পছন্দের গান ও বক্তব্যসহ পরিবেশনা করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।
শিরান আরও বলেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সফরের প্রচারক ও অনুষ্ঠানস্থলের মালিকদের। তিনি জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য পুরো সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। এমনকি অনুষ্ঠানস্থলের মালিক, রবার্ট ক্রাফট এবং উভয় পক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আয়োজক ও ভেন্যু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। Guardian+1
শিরান আরও জানান, তিনি নিজের মঞ্চকে বিভিন্ন পটভূমি ও সংস্কৃতির মানুষের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা হিসেবে রাখতে চান। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত থাকলেও তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান না নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি সংঘাত বা মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে চিন্তিত নন।
তবে ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার পর বিতর্ক আরও বড় আকার নেয়। তাঁর প্রতি সংহতি জানিয়ে শিরানের সফরের অন্য সহযোগী শিল্পীদের কয়েকজনও বাকি অনুষ্ঠানগুলো থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম, অ্যারন রো এবং আইরিশ ব্যান্ড বেওগা। তাঁদের সরে দাঁড়ানোর ফলে শিরানের সফর নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এদিকে ম্যাকলমোরও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বরং তিনি তাঁর সফর থেকে পাওয়া প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করা ছয়টি সংগঠনকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি রবার্ট ক্রাফটকেও সমপরিমাণ অর্থ অনুদান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে শিরান, ম্যাকলমোর ও সফরের আয়োজকদের অবস্থান ভিন্ন হলেও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে শিল্পীদের মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার স্বাধীনতা, অনুষ্ঠানস্থল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং শিল্পীদের ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশের সীমা। ঘটনাটি একই সঙ্গে সংগীতশিল্পীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
পড়ুন:দেশের ৫ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আশঙ্কা
ইমি/


