দেশে নগদ টাকার পাশাপাশি দিন দিন বাড়ছে কার্ডভিত্তিক লেনদেন। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণও দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে প্রিপেইড কার্ডে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশি নাগরিকরা বিদেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে মোট ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেন করেছেন। এসব লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসটিতে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার করে প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে বিদেশে কার্ড লেনদেন কমেছে প্রায় ৫২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে দেশে কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৩৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৮টি। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ড ছিল ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ছিল ৯ লাখ ৮১ হাজার ১৫৮টি। সব মিলিয়ে দেশে কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ৪ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৫টি, ক্রেডিট কার্ড ২৭ লাখ ২ হাজার ৬৯৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯০ লাখ ৮১ হাজার ৩২৯টি।
অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। কার্ডের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে তিন ধরনের কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছিল ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে পাঁচ বছরে কার্ডভিত্তিক মোট লেনদেন বেড়েছে ১০৮ শতাংশ।
কার্ডের ধরন অনুযায়ী প্রবৃদ্ধিতে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ২৮ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।
কার্ডের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে এই প্রিপেইড কার্ডে। বিভিন্ন ধরনের অনলাইন ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে সহজ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় এ ধরনের কার্ডের বিস্তার ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট খাতের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আগের মাস জুনে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেন কমেছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় ক্রেডিট কার্ডের মোট লেনদেনের ৯০ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ টাকা উত্তোলনের অংশ ছিল ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরের অংশ ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
জুলাইয়ে বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের মোট ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
দেশভিত্তিক হিসাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে, যা বিদেশে মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। এরপর থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ডেবিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় গন্তব্য। জুলাইয়ে দেশটিতে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে ৫১ কোটি ৬০ লাখ, ভারতে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ, চীনে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ এবং আয়ারল্যান্ডে ৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। সব মিলিয়ে বিদেশে বাংলাদেশিদের ডেবিট কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪০১ কোটি ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রিপেইড কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড লেনদেন বেড়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের ব্যয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
গত এক বছরে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ছিল ৩ হাজার ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। জুলাইয়ে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেন ২০২৫ সালের আগস্টে ৮৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকায় ওঠে। জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৮টি তপশিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে অনুমোদিত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া বা স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। এসব পরিসংখ্যান দেশের ব্যাংকিং খাতে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও তুলে ধরছে।
পড়ুন:৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজবে বাংলাদেশ ব্যাংক, সর্বোচ্চ ২০ লাখ ঋণ সহায়তা
ইমি/


