রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি ও নিকেতন লেকের দূষণ বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করছে。 সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব লেকের পানি গৃহস্থালির পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত।
লেকের এই শোচনীয় অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী পরিবেশগত সুরক্ষায় সব সংস্থাকে সাথে নিয়ে একটি সমন্বিত ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আয়োজিত বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন তিনি।
বৈঠকে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার লেকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দূষণের উৎস এবং সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একইসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ধানমণ্ডি লেকের সংস্কার, স্লাজ অপসারণ ও পাইলট প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে জানানো হয়, গুলশান লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের উৎস ও মাধ্যম হিসেবে ছয়টি প্রাইমারি এবং ছয়টি সেকেন্ডারি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে লেকে দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ করছে। সমস্যা সমাধানে গঠিত কারিগরি কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সামনে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ উপস্থাপন করে।
লেকের দূষণ রোধে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ, ভবন ভিত্তিক এসটিপি স্থাপন এবং বিদ্যমান স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত জরিপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় শর্তসাপেক্ষে স্যুয়ারেজ বিল আদায় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা পানি সংগ্রহের জন্য এলাকা তৈরির বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
লেকের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ভাসমান বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ১০টিতে উন্নীত করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ভাসমান এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে লেকের তলদেশে জমে থাকা স্লাজ অপসারণ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকে ‘ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী প্রযোজ্য ভবনগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করা হয়।বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি বৃষ্টির পানির ড্রেন বা লেকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করে অবৈধ সংযোগ বন্ধে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া লেকের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানোর যন্ত্র (এরেটর) স্থাপন, দুর্গন্ধ দূর করতে জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রস্তাবও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠকে রাজউকের আওতাধীন লেকগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতে ইতোমধ্যেই ৪২ জন জনবলের সমন্বয়ে পাঁচটি বিশেষ টিম নিয়োজিত করা হয়েছে উল্লেখ করা হয়।
বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
লেকগুলোর বর্তমান দূষণ পরিস্থিতি ও প্রধান উৎস
পয়ঃবর্জ্যের সরাসরি সংযোগ: গুলশান, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার হাজার হাজার বহুতল ভবনের সেপটিক ট্যাংক বা স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকের ড্রেনের সাথে যুক্ত। ফলে পরিশোধিত না হওয়া মানববর্জ্য সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের খনি: আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার প্রধান লেকগুলোর মধ্যে গুলশান লেক সবচেয়ে বেশি দূষিত। এর পানিতে প্রতি লিটারে ৩৬টি এবং তলদেশের প্রতি কেজি কাদায় ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
মাছের দেহে বিষ: ধানমন্ডি লেকের মাছের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, সংগৃহীত ৯৩%-এর বেশি মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করেছে, যা মানবদেহের খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে।
অক্সিজেনের শূন্যতা: অতিরিক্ত দূষণের কারণে গুলশান ও ধানমন্ডি লেকের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা (Dissolved Oxygen) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে (কিছু অংশে ০.১২ মিগ্রা/লিটার পর্যন্ত), যা জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার অনুপযোগী।
পড়ুন : দেশের ৫ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আশঙ্কা


