বিজ্ঞাপন

‘কর্জে হাসানা’ কী: ঋণগ্রহীতার প্রতি ইসলামের যে নির্দেশনা

বিজ্ঞাপন

মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন সামর্থ্য থাকলেও প্রয়োজনের মুহূর্তে হাতে অর্থ থাকে না। অসুস্থতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পারিবারিক সংকট কিংবা আকস্মিক বিপদে সাময়িক আর্থিক সংকট মানুষকে অসহায় করে তুলতে পারে। এমন সময়ে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে নিঃস্বার্থভাবে তার প্রয়োজন পূরণে ঋণ দেওয়া ইসলামের একটি মহান মানবিক শিক্ষা। ইসলামের পরিভাষায় এটিই কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৪৫)

এখানে ‘আল্লাহকে ঋণ দেওয়া’ বলতে বাস্তব অর্থে আল্লাহকে ঋণ দেওয়া বোঝানো হয়নি। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করাকে মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় ‘আল্লাহকে ঋণ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করলে, সে মূলত আল্লাহর কাছে নিজের জন্য প্রতিদানের ব্যবস্থা করে।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৭)

যেসব কারণে কর্জে হাসানা গুরুত্বপূর্ণ

বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো: প্রয়োজনের সময় ঋণ চাইতে গিয়ে অনেক মানুষকে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়। কর্জে হাসানা তাকে সুদের বোঝা থেকে রক্ষা করে প্রয়োজন পূরণের সুযোগ করে দেয়। এভাবে একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের সংকট দূর করার কাজে অংশ নেন।

সুদনির্ভরতা থেকে সমাজকে রক্ষা: ইসলামে সুদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর্থিক সংকটে সুদভিত্তিক ঋণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরবর্তী সময়ে তা আরও বড় বোঝা তৈরি করতে পারে। এর বিপরীতে কর্জে হাসানা সহযোগিতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।

ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: ইসলাম মুসলমানদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতায় উৎসাহিত করেছে। কর্জে হাসানা সেই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ। একজনের অতিরিক্ত সম্পদ যখন অন্যের সাময়িক প্রয়োজন পূরণে কাজে আসে, তখন সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম: কর্জে হাসানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ঋণদাতা নিজের মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন; তবে এর বিনিময়ে সুদ বা পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারেন না। তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন মানুষের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা।

অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া

কর্জে হাসানা নেওয়ার পর ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধ করতে না পারলে এবং সত্যিই অসচ্ছল হলে, ইসলাম তাকে অবকাশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি ঋণগ্রহীতা অসচ্ছল হয়, তবে তার স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম—যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিনের বিপদ থেকে রক্ষা করুন, সে যেন অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে অবকাশ দেয় অথবা তার ঋণ মাফ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৬৩)

অর্থাৎ, ঋণ দেওয়ার যেমন ফজিলত রয়েছে, তেমনি ঋণগ্রহীতা প্রকৃত সংকটে পড়লে তাকে সময় দেওয়া কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ মওকুফ করে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে বড় সওয়াব।

ঋণ পরিশোধে উত্তম আচরণ কাম্য

ইসলাম শুধু ঋণ দেওয়ার শিক্ষা দেয়নি; সময়মতো ঋণ পরিশোধ করাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ঋণ নিয়েছেন এবং উত্তমভাবে তা পরিশোধ করেছেন।

হজরত আবু রাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) একটি উট ঋণ নিয়েছিলেন। পরে পরিশোধের সময় সমমানের পরিবর্তে আরও উত্তম উট পাওয়া গেলে তিনি সেটিই ফেরত দিতে নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে উত্তম তারা, যারা ঋণ পরিশোধে উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬০০)

কর্জে হাসানা ও দানের মধ্যে পার্থক্য

দান ও কর্জে হাসানা—দুটিই কল্যাণমূলক কাজ হলেও এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। দানের ক্ষেত্রে সম্পদ দেওয়ার পর সাধারণত তা ফেরত নেওয়া হয় না। অন্যদিকে, কর্জে হাসানায় ঋণদাতা তার মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন।

তাই কর্জে হাসানা হলো এমন ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া, যিনি বর্তমানে আর্থিক সংকটে আছেন, কিন্তু ভবিষ্যতে তা পরিশোধ করতে সক্ষম হবেন। এর মাধ্যমে একই অর্থ ঘুরে ঘুরে একাধিক মানুষের উপকারে আসতে পারে।

তবে কর্জে হাসানা মানে ঋণদাতার অধিকার উপেক্ষা করা নয়। ইসলাম ঋণ লেনদেনকে সুসংগঠিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াতেই ঋণ লিখে রাখার নির্দেশ এসেছে।

আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮২)

বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে অনেক মানুষ সুদের ঋণের দিকে বাধ্য হয়। এমন পরিস্থিতিতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও সামর্থ্যবান মুসলমানদের মধ্যে কর্জে হাসানার সংস্কৃতি পুনর্জীবিত করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতার দায়িত্ব হলো ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আন্তরিক থাকা এবং সামর্থ্য অর্জিত হলে দ্রুত তা পরিশোধ করা। আর ঋণদাতার দায়িত্ব হলো অসচ্ছল ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।

এভাবেই কর্জে হাসানা শুধু একটি আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহৎ মাধ্যম।

পড়ুন: কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য পেতে যে ৪ আমল করবেন

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন