রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটির মতে, নির্মাণ ব্যয়ের উচ্চ হার ও বৈদেশিক ঋণের কারণে বাংলাদেশ মেট্রোরেল ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। ব্যয় ও ঋণের চাপ কমাতে মেট্রোরেল নির্মাণে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্বচ্ছ দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে মেট্রোরেল আদৌ প্রয়োজন কি না এবং প্রয়োজন হলে কখন তা দরকার—সেটিও বিশ্লেষণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা: আইপিডির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় পরিবহন ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। আইপিডি আয়োজিত ভার্চুয়াল সভায় তারা মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় এক লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ২০১৯ সালে নির্ধারিত ব্যয়ে রাজি না হওয়ায় সরকার এ অনুমোদন দেয়।
এর ফলে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিমানবন্দর-পূর্বাচল-কমলাপুর মেট্রোরেলের (এমআরটি-১) ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ আমিনবাজার-গাবতলী-মিরপুর-ভাটারা মেট্রোরেলের (এমআরটি-৫ উত্তর) ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
জাপানের ঋণে পরিচালিত প্রকল্পে জাইকার শর্ত অনুযায়ী দরপত্র নির্ধারিত হয়। ফলে জাপান ছাড়া অন্য কোনো দেশের ঠিকাদার ও পরামর্শকদের কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। জাপানি প্রতিষ্ঠানই সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা করেছে এবং নকশাও করেছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ উত্তরের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
আইপিডির আলোচনা সভায় পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা এসব কারণ তুলে ধরে প্রকল্প দুটির অনুমোদনের সমালোচনা করেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ঢাকাকে ‘ট্র্যাপে’ ফেলেছে। এতে গণপরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৫ সালে জাইকার আর্থিক সহায়তায় প্রণীত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) মেট্রোরেলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এসটিপিতে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি মেট্রোরেলের প্রস্তাব ছিল। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ১২০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ ছয়টি মেট্রোরেলের প্রস্তাব করা হয়।
তিনি বলেন, মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পে সরকারের আগ্রহ থাকলেও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এত বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে অংশীজনের পর্যাপ্ত মতবিনিময়ও হয়নি।
গত বুধবার একনেকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়। গাবতলী থেকে আসাদগেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেলের ব্যয় হবে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
আইপিডির সভার প্রবন্ধে বলা হয়, এডিবির প্রকল্পে মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, জাইকার অর্থায়নে এমআরটি-১-এর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় তিন হাজার ৬৬১ কোটি টাকা এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পে চার হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। ব্যয়ের এই বড় পার্থক্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
একনেকের কার্যতালিকায় না থাকা সত্ত্বেও এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (উত্তর) দ্রুত অনুমোদনের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইপিডি। সংস্থাটি বলেছে, কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালুর সম্ভাবনা থাকলেও বিদ্যমান রেলপথটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অথচ এর সমান্তরালে বিপুল অর্থ ব্যয়ে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে কুড়িল-পূর্বাচল করিডোরে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, দেশে বিপুল অর্থের মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও ইঞ্জিনের কারণে একের পর এক লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মালবাহী ট্রেনও নিয়মিত পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, ঢাকায় দিনে চার কোটি ট্রিপ হয়। বর্তমানে এর মাধ্যমে মাত্র ১ শতাংশ মেট্রোতে হয়। অথচ এর অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল চালু হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি ট্রিপ সম্ভব না।
বিআইপির সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ঢাকায় মেগা প্রকল্প ও বিনিয়োগ বাড়লে শহরের প্রতি মানুষের আকর্ষণও বাড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগের জন্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আরও বেশি ঢাকামুখী হতে পারে। এ ধরনের বিনিয়োগ দেশের অন্যান্য শহরের বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি শুধু আর্থিক সমন্বয়ের বিষয় নয়; এটি পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক পরামর্শক স্থপতি শোয়েব হাসান শ্রাবণ বলেন, এমআরটি-১-এর পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যমান পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের যথাযথ বিবেচনা করা হয়নি। কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথকে কার্যকর ও দ্রুতগতির গণপরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এমআরটি-১-এর প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, শহরের ধারণক্ষমতা ও পরিবহন চাহিদা ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে একদিকে যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে বড় প্রকল্পের ঋণের চাপও বাড়ছে।
সূত্র: সমকাল
পড়ুন: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের তৎপরতা, বাড়ছে গোয়েন্দা নজরদারি
আর/


