সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের। অথচ সেই বনভূমি থেকেই গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনায় বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা বন বিটে ৩০টি আকাশমনি গাছ কাটার এ ঘটনায় জব্দ করা হয়েছে ৭০ খণ্ড কাঠ। তবে অভিযোগ, কাঠ জব্দের পরও তা বন বিট অফিসে নেওয়া হয়নি। ঘটনাস্থলের কাছে অভিযুক্ত কাঠ ব্যবসায়ীকে পাওয়া গেলেও তাঁকে আটক করা হয়নি। এমনকি ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকার দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর রেঞ্জ আওতাধীন চন্দ্রা বন বিটের সিনাবহ বংশীপাড়া মাঠের দক্ষিণ পাশে সংরক্ষিত বনভূমির উপকারভোগী রুহুলের প্লট থেকে গাছগুলো কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আকাশমনি উডলট বাগানের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোহেল মিয়া, সাধারণ সম্পাদক শহীদ এবং চন্দ্রা বন বিটের বন প্রহরী লুৎফরের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। আর গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত হিসেবে কাঠ ব্যবসায়ী বাবু মোল্লার নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনভূমির প্লট থেকে ৩০টি আকাশমনি গাছ কেটে নিয়ে যান কাঠ ব্যবসায়ী বাবু মোল্লা। এ কাজে আকাশমনি উডলট বাগানের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি বন প্রহরী লুৎফরের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাকে জানানো হলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কাটা গাছের ৭০টি খণ্ড জব্দ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাঠগুলো সিনাবহ খন্দকারপাড়া সংরক্ষিত বনভূমির ৮৬ নম্বর দাগ থেকে জব্দ করা হয়। তবে জব্দ করা কাঠ বন বিট অফিসে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, অভিযোগ অনুযায়ী, কাঠ ব্যবসায়ী বাবু মোল্লাকে হাতের কাছে পাওয়া গেলেও তাঁকে আটক করে জব্দ করা কাঠসহ বন বিট অফিসে নেওয়া হয়নি। এতে কাঠ জব্দের পর বন বিভাগের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জব্দ করা কাঠ কোথায় রাখা হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক না করার কারণ কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বনভূমি পাহারা দেওয়া এবং অবৈধভাবে গাছ কাটা প্রতিরোধ করা বন প্রহরীদের অন্যতম দায়িত্ব। অথচ চন্দ্রা বন বিটের বন প্রহরী লুৎফরের বিরুদ্ধে গাছ কাটার ঘটনায় যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগটি শুধু একজন বন প্রহরীর দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন নয়; বরং বনভূমি রক্ষার তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় আকাশমনি উডলট বাগানের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোহেল মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক শহীদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চন্দ্রা বন বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে আমাদের লোকজন পাঠানো হয়েছে। কাঠগুলো জব্দ করা হয়েছে। তবে গাড়ি না পাওয়ায় অফিসে আনা হয়নি। সন্ধ্যার মধ্যে গাছগুলো অফিসে নিয়ে আসা হবে এবং এসব ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালিয়াকৈর রেঞ্জ কর্মকর্তা তৌসিফ জোয়াযেদ বলেন, বনভূমির জমি থেকে গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। বনভূমির জমি থেকে অবৈধভাবে গাছ কেটে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গাছগুলো অতি দ্রুত জব্দ করাসহ এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন কর্মকর্তারা গাছ জব্দ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও সেই আশ্বাসের বাস্তবায়নই এখন দেখার বিষয়। জব্দ করা কাঠ বন বিট অফিসে নেওয়া হয়েছে কি না, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সংরক্ষিত বনভূমি থেকে গাছ কাটার অভিযোগের পাশাপাশি বন বিভাগের এক কর্মীর বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বনভূমি রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এখন প্রশ্ন—চন্দ্রা বন বিটের এ ঘটনায় তদন্ত কতদূর এগোবে? জব্দ করা কাঠের যথাযথ হিসাব মিলবে কি? আর বনভূমি থেকে গাছ কাটার ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের বিরুদ্ধেই যদি বনভূমির গাছ কাটায় সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সংরক্ষিত বনভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে।
পড়ুন:দুই দশকেও নিজস্ব ভবন পায়নি নীলফামারী চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
ইমি/


