মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার এবং সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তিনির্ভর মোবাইল অ্যাপ ‘ভূমিদৃষ্টি’ চালু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত কর্মস্থলের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থান করেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা দিতে হবে। ফলে কর্মস্থলের বাইরে থেকে হাজিরা দেওয়া বা ভুয়া লোকেশন ব্যবহার করে উপস্থিতি দেখানোর সুযোগ কমবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অ্যাপটির উদ্বোধন করেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। অ্যাপটি তৈরিতে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে পারাল্যাক্সলজিক ইনফোটেক।
‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপের মূল বৈশিষ্ট্য হলো জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে প্রতিটি ভূমি অফিসের জন্য নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অবস্থান করলেই মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে অফিসে ‘চেক-ইন’ করতে পারবেন।
অর্থাৎ কর্মস্থলের নির্ধারিত এলাকার বাইরে অবস্থান করে নিয়মিত অফিস হাজিরা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অ্যাপের মাধ্যমে কর্মস্থলে উপস্থিতির তথ্য প্রযুক্তিনির্ভরভাবে সংরক্ষিত হবে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ভূমি কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজিরা ব্যবস্থায় আরও বেশি স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্ধারিত কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত রয়েছেন কি না, তা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপে ভুয়া লোকেশন ব্যবহার করে হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কেউ যদি প্রকৃত কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে ‘ফেক লোকেশন’ ব্যবহার করে হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা বা রেড অ্যালার্ট পাঠানো হবে।
এতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত অনিয়মের বিষয়টি জানতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজিরা ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর ফলে কর্মস্থলে উপস্থিতির ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা আরও বাড়বে বলে আশা করছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসের বাইরে যেতে হলে সেটিকে অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এ জন্য অ্যাপটিতে ‘সাইট ভিজিট’ নামে আলাদা একটি ফিচার রাখা হয়েছে।
দাপ্তরিক কাজ, তদন্ত, পরিদর্শন বা অন্য কোনো সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য অফিসের বাইরে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাপের মাধ্যমে সাইট ভিজিটের কারণ উল্লেখ করতে পারবেন। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসের বাইরে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে সম্পর্কেও একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে।
এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের ধরন ও গতিবিধি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আরও সংগঠিত তথ্য থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
‘ভূমিদৃষ্টি’ শুধু হাজিরা ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটির আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি তাদের ছুটির হিসাবও অ্যাপে সংরক্ষিত থাকবে।
ফলে হাজিরা, ছুটি এবং সাইট ভিজিট—কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কাগজভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে।
প্রাথমিকভাবে দেশের ছয়টি জেলায় ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপের পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলাগুলো হলো ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় এসব জেলার মোট ৬১০টি ভূমি কার্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কার্যালয়ের ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অ্যাপটির আওতায় আনা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে অ্যাপটির কার্যকারিতা, ব্যবহারিক সুবিধা এবং সম্ভাব্য সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এর পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিস্তৃত মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসনকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থিতি ও কর্মপর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, সারাদেশে এই ব্যবস্থা চালু করা গেলে ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দাপ্তরিক কার্যক্রমের তথ্য আরও সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করা যাবে।
ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নাগরিক সেবা প্রদানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে সাধারণ মানুষকে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও অন্যান্য ভূমি কার্যালয়ে যেতে হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মিত উপস্থিতি বা দাপ্তরিক কার্যক্রমে বিলম্ব হলে সেবা গ্রহণকারীদের ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় মনে করছে, প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থিতি ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও নিয়মতান্ত্রিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, ‘ভূমিদৃষ্টি’ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসনে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে। হাজিরা, সাইট ভিজিট ও ছুটির তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণের ফলে প্রশাসনিক নজরদারি ও ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
সবশেষে, পাইলট প্রকল্পের ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও উন্নয়ন আনার পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব ভূমি অফিসে ‘ভূমিদৃষ্টি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও ভোগান্তিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাই ভূমি মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য।
পড়ুন:কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা কতটা বাস্তব?
ইমি/


