বাংলা চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় কত তারকারই তো আগমন ঘটেছে, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন অনেকে। কেউ রেখে গেছেন অভিনয়ের স্মৃতি, কেউবা হয়ে উঠেছেন কোনো একটি প্রজন্মের প্রিয় মুখ। তবে এমন কিছু তারকা আছেন, যাদের উপস্থিতির সময়কাল খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও প্রভাব থেকে যায় যুগের পর যুগ। ঢাকাই চলচ্চিত্রের তেমনই এক ক্ষণজন্মা নক্ষত্র সালমান শাহ। পর্দায় যার পথচলা থেমে গেছে প্রায় তিন দশক আগে, কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তার জনপ্রিয়তায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি।
আজ ১৯ সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই নায়ক। অল্প বয়সেই বিনোদন জগতে তার পথচলা শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন তিনি। পরে টেলিভিশন নাটক ও বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন। তবে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে ১৯৯৩ সালে।
সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় সালমান শাহের। প্রথম সিনেমাতেই তার বিপরীতে অভিনয় করেন মৌসুমী। সিনেমাটি মুক্তির পর রাতারাতি দর্শকের নজর কাড়েন তরুণ এই অভিনেতা। তার অভিনয়, চেহারা, ব্যক্তিত্ব ও পর্দায় উপস্থিতি সে সময়ের দর্শকদের কাছে নতুন এক নায়ককে পরিচয় করিয়ে দেয়।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সালমান শাহকে। মাত্র তিন থেকে চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি অভিনয় করেন ২৭টি সিনেমায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’। এসব সিনেমার বেশ কয়েকটি সে সময় ব্যবসায়িকভাবে সফল হয় এবং তাকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সালমান শাহের জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ ছিল তার অভিনয়ের ধরন ও পর্দায় উপস্থিতির স্বাতন্ত্র্য। রোমান্টিক চরিত্র থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক গল্প—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রাণবন্ত হাসি, সাবলীল সংলাপ উপস্থাপন এবং ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
তবে অভিনয়ের পাশাপাশি ফ্যাশনেও সালমান শাহ তৈরি করেছিলেন আলাদা একটি ধারা। নব্বইয়ের দশকে তার পোশাক, চুলের স্টাইল, সানগ্লাস, ব্যান্ডানা এবং বাইক ব্যবহারের ধরন তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি করে। সময়ের তুলনায় তার ফ্যাশন ছিল বেশ আধুনিক। ফলে শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, ব্যক্তিগত স্টাইলেও তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের অনুকরণের অন্যতম প্রতীক।
সিনেমা সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি তার ভক্তদের অনেকেই মনে করেন, সালমান শাহ তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের যে ফ্যাশন ও স্টাইল তাকে ঘিরে জনপ্রিয় হয়েছিল, তার অনেক উপাদান পরবর্তী সময়ের তারকাদের মধ্যেও দেখা গেছে। এ কারণেই ভক্তদের কাছে তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন; বরং একটি সময়ের প্রতীক।
কিন্তু মাত্র ২৫ বছর বয়সেই থেমে যায় সেই পথচলা। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের মৃত্যু হয়। তার অকাল মৃত্যু ঢালিউডে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও, সালমান শাহের শিল্পীজীবনের প্রভাব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তার চলে যাওয়া চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
সালমান শাহের মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন দশক। এর মধ্যে ঢাকাই চলচ্চিত্রে এসেছে বহু নতুন মুখ, বদলেছে সিনেমার ভাষা, প্রযুক্তি ও দর্শকের রুচি। বদলেছে তারকাদের পোশাক ও উপস্থাপনের ধরনও। কিন্তু সালমান শাহের জনপ্রিয়তা আজও টিকে আছে।
তার সিনেমাগুলো এখনো টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করে। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকও তার পুরোনো সিনেমা ও গান নিয়ে আগ্রহ দেখান। চলচ্চিত্রে পরবর্তী সময়ে আসা অনেক অভিনয়শিল্পীও বিভিন্ন সময়ে সালমান শাহকে নিজেদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ার। মাত্র ২৭টি সিনেমা। আর মাত্র ২৫ বছর বয়সে জীবনাবসান—সংখ্যার হিসাবে হয়তো খুব ছোট একটি অধ্যায়। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসার বিচারে সেই অধ্যায়ই হয়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী। রূপালি পর্দায় তার উপস্থিতি থেমে গেলেও স্মৃতির পর্দায় তিনি এখনো একই রকম প্রাণবন্ত।
আজ সালমান শাহের জন্মদিনে তাই আবারও তাকে স্মরণ করছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। নতুন প্রজন্মের কাছে তারকা হয়ে ওঠার গল্প যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি তার অকাল প্রস্থান মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একজন শিল্পীর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রয়োজন হয় না; অল্প সময়ের উপস্থিতিও তাকে চিরস্থায়ী করে তুলতে পারে।
সালমান শাহ তেমনই এক নাম—যার চলচ্চিত্রযাত্রা ছিল স্বল্প, কিন্তু যার প্রভাব দীর্ঘ। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে; তবু ‘স্বপ্নের নায়ক’ সালমান শাহ এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে এক অমলিন আবেগ।
পড়ুন:পুরনোটার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘জাকিরের’ ৫ মিনিটের ভিডিও ভাইরাল
ইমি/


