বিজ্ঞাপন

সীমান্তঘেঁষা মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প নিয়ে ‘ডাঙগোয়াল’

বিজ্ঞাপন

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, কাঁটাতারের সংকট, সামাজিক বাস্তবতা এবং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম—এসব নিয়েই নির্মিত হয়েছে নতুন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ডাঙগোয়াল’। দেশের সীমান্তঘেঁষা জনপদের মানুষের জীবন থেকে উঠে আসা নানা বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের গল্পে উঠে এসেছে এমন এক জনজীবন, যা মূলধারার আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পায় না।

লালমনিরহাটের সাংস্কৃতিক কর্মী শাহীদুজ্জামান লাবলুর বাস্তব জীবনের গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন জ্যোতির্ময় রায়। সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন ও তাদের নানা সংকটকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই চলচ্চিত্রটির গল্পের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন নির্মাতা।

‘ডাঙগোয়াল’ শব্দটির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে সীমান্ত এলাকার একটি বিশেষ বাস্তবতা। সীমান্ত অঞ্চলে গরু, চোরাই পণ্য কিংবা মানুষ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের স্থানীয় ভাষায় ‘ডাঙগোয়াল’ বলে অভিহিত করা হয়। শব্দটির মধ্যেই যেমন সীমান্তবর্তী জীবনের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় রয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মাতা জ্যোতির্ময় রায় জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ছিটমহল ও সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনকাহিনি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তার। সীমান্তের মানুষ কীভাবে প্রতিদিনের জীবনযাপন করেন, কীভাবে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেন এবং সীমানার বাস্তবতা কীভাবে তাদের জীবনে প্রভাব ফেলে—এসব বিষয় তাকে দীর্ঘদিন ধরে ভাবিয়েছে।

সেই ভাবনা থেকেই একসময় তিনি সীমান্তবর্তী জীবনের গল্প খুঁজতে শুরু করেন। এ সময় শাহীদুজ্জামান লাবলুর একটি নাটক তার নজরে আসে। নাটকটি দেখার পর নির্মাতা লাবলুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার সঙ্গে দেখা করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে লাবলু তার নিজের জীবনের কিছু বাস্তব ঘটনা এবং নাটক লেখার সময় তার ভেতরে তৈরি হওয়া নানা মানসিক টানাপোড়েনের কথা তুলে ধরেন।

সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিই পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রটির গল্পের ভিত্তি তৈরি করে। নির্মাতার কাছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এই জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সীমান্তের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে যে বাস্তবতা বোঝা যায়, তার ভেতরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। ‘ডাঙগোয়াল’ সেই অভিজ্ঞতারই একটি শিল্পিত প্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলচ্চিত্রটিতে সীমান্তকে কেবল ভৌগোলিক সীমানা হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং মানুষের জীবন, স্বপ্ন, সংকট এবং টিকে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে সীমানার সম্পর্ককে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া যেখানে একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করে, সেখানে সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেক সময় সেই সীমানার নানা বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।

‘ডাঙগোয়াল’-এর গল্পে সেই জীবন বাস্তবতার পাশাপাশি উঠে আসবে মানুষের মানসিক টানাপোড়েনও। জীবিকা, সামাজিক পরিস্থিতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি সীমান্তঘেঁষা জনপদের মানুষের একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন দীপক কুমার গোস্বামী, দিলরুবা দোয়েল, শাহানা সুমি, উজ্জ্বল মিয়া, বিধান রায়সহ ভাটিবাড়ি লোক নাট্যদলের একাধিক সদস্য। স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ চলচ্চিত্রটির পরিবেশ ও চরিত্রগুলোকে আরও বাস্তবঘনিষ্ঠ করে তুলেছে বলে মনে করছেন নির্মাণসংশ্লিষ্টরা।

নির্মাতা জ্যোতির্ময় রায়ের জন্যও ‘ডাঙগোয়াল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ প্রচলিত গল্পের বাইরে গিয়ে সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন ও বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা গল্পকে স্বল্পদৈর্ঘ্যের পর্দায় তুলে ধরার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে সীমান্তের একটি ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করতে চেয়েছেন নির্মাতা।

চলচ্চিত্রটির নির্মাণের পাশাপাশি এখন চলছে প্রদর্শনের প্রস্তুতি। নির্মাতা সূত্রে জানা গেছে, ‘ডাঙগোয়াল’ আপাতত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে প্রদর্শনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটিকে দেশ-বিদেশের দর্শক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

উৎসব পর্ব শেষ হওয়ার পর সাধারণ দর্শকদের জন্যও ‘ডাঙগোয়াল’ মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কিংবা ইউটিউবের মাধ্যমে দর্শকের কাছে চলচ্চিত্রটি পৌঁছে দেওয়া হতে পারে। তবে কোন প্ল্যাটফর্মে এবং ঠিক কবে এটি মুক্তি পাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গ্রাম, শহর, নদী কিংবা নানা সামাজিক বাস্তবতার গল্প নিয়মিত উঠে এলেও সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবন নিয়ে কাজ তুলনামূলকভাবে কম। সেই জায়গা থেকে ‘ডাঙগোয়াল’ আলাদা একটি বিষয়কে সামনে আনছে। সীমান্তের কাঁটাতার, জীবিকার সংকট, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনপদের জীবনকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে চলচ্চিত্রটি।

‘ডাঙগোয়াল’ তাই শুধু একটি সীমান্তের গল্প নয়; বরং সেই সীমান্তের ছায়ায় বসবাস করা মানুষগুলোর গল্প। তাদের প্রতিদিনের লড়াই, টিকে থাকার চেষ্টা এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে নেওয়ার গল্প। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর সাধারণ দর্শকের সামনে এলে সীমান্তঘেঁষা মানুষের এই না-বলা গল্প কতটা সাড়া জাগায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

পড়ুন:পুরনোটার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘জাকিরের’ ৫ মিনিটের ভিডিও ভাইরাল

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন