বিজ্ঞাপন

তেল সংকটে বিশ্ববাজারে চাপ, বাড়তে পারে জিনিসপত্রের দাম

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববাজারে আবারও দ্রুত বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে।

বেশিরভাগ দেশেই পেট্রল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে ঘরবাড়িতে ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইকারি দামও বেড়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সুদের হার বাড়তে পারে। এর ফলে ঋণ ও বন্ধকের খরচও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কেন বাড়ছে তেল ও গ্যাসের দাম?

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়াই সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের বেশি। গত জুনে এই দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে পেট্রল ও ডিজেলের বাজারেও। যুক্তরাজ্যে পেট্রলের গড় দাম প্রতি লিটারে ১৭০ পেন্স ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে এই দাম ছিল প্রায় ১৫০ পেন্স।

যুক্তরাষ্ট্রেও এক গ্যালন বা প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার পেট্রলের দাম জুলাইয়ের ৩ দশমিক ৮০ ডলার থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৩২ ডলারে উঠেছে। দেশটিতে ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে—প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের বেশি।


হরমুজ প্রণালিতে বাধা

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেলজাতীয় পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্যিক জাহাজ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে এই পথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাপকভাবে কমে যায়।

যুদ্ধের পর সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত থাকা ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের মাধ্যমে তেল রপ্তানি বাড়ায়। এই পাইপলাইনের দৈনিক ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু শুক্রবার ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। হামলার জন্য সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিরাও গত সপ্তাহে সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এসব হামলায় আগুন ধরে যায় এবং কিছু স্থাপনার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়ামের মতে, মেরামতের জন্য পাইপলাইনটি আট সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, এটি খুব শিগগিরই আবার চালু হবে।


কমেছে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন

যুক্তরাষ্ট্র সরকার বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগের মতোই জ্বালানি পরিবহন হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ স্বাধীন বিশ্লেষকের মতে, জলপথটি এখনো বড় ধরনের বাধার মুখে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাতীয় পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

তবে সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, আগস্টের শেষ নাগাদ এই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় প্রায় ৮৬ লাখ ব্যারেলে।

বাব আল-মান্দাবেও বাড়ছে ঝুঁকি

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। গত দুই সপ্তাহে ইয়েমেনে হুথিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে এই এলাকার কাছাকাছি কৌশলগত কিছু অঞ্চল দখল করেছে।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এছাড়া বিশ্বে সরবরাহ করা মোট তেলের আরও প্রায় ৫ শতাংশ সাধারণত লোহিত সাগরের উত্তর দিক দিয়ে সুয়েজ খাল এবং মিসরের একটি পাইপলাইন হয়ে ভূমধ্যসাগরে যায়।

ফলে এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আরও বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

গত জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি জাহাজ ও বন্দরকে লক্ষ্য করে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী অন্য দেশের জাহাজে হামলা না করার কথাও জানিয়েছিল তারা।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও আছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ ইরান নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

বিশ্লেষকেরাও বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডিজেলের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিজেল রপ্তানিকারক।

তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ার বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার।


বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সাধারণত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এর ফলে মানুষের আয় ও মজুরির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশ বাড়তি থাকলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে এবং দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে।

জুন থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তা আইএমএফ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ওই হিসাবের জন্য ব্যবহৃত পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

তবে পরিস্থিতি সব সময় এমন নাও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি বা সমঝোতা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার কমে যেতে পারে। এর আগে জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি হওয়ার পর তেলের দাম দ্রুত কমে যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে গিয়েছিল। তার আগে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

পড়ুন: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের তৎপরতা, বাড়ছে গোয়েন্দা নজরদারি

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন