রেকর্ড বই নতুন করে লেখা যেন লিওনেল মেসির পুরোনো অভ্যাস। বয়স ৩৯ ছুঁলেও মাঠে একের পর এক নতুন কীর্তি গড়ে চলেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) চলতি মৌসুমেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তিনি। সান দিয়েগো এফসির বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির ২-২ গোলের ড্র ম্যাচে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল করে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মেসি।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি ২০২৬ এমএলএস মৌসুমে নিজের গোলসংখ্যা ২০-এ নিয়ে গেছেন মেসি। একই সঙ্গে এমএলএসের ইতিহাসে টানা তিন মৌসুমে অন্তত ২০ গোল করা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির (এলএএফসি) ডেনিস বুয়াঙ্গা ২০২৩ থেকে ২০২৫—টানা তিন মৌসুমে এই কীর্তি গড়েছিলেন।
চলতি মৌসুমে ২০ গোলের পাশাপাশি মেসির অ্যাসিস্ট রয়েছে ১৩টি। অর্থাৎ গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ইন্টার মায়ামির হয়ে ৩৩টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। ফলে এমএলএসের গোল্ডেন বুটের দৌড়েও রয়েছেন শীর্ষে।
নিয়মিত মৌসুমে এখনো আটটি ম্যাচ বাকি। এর মধ্যেই মেসি এমএলএসের ‘ল্যান্ডন ডোনোভান এমভিপি’ পুরস্কার জয়ের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছেন। পুরস্কারটি জিতলে এমএলএস ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনবার এই স্বীকৃতি পাওয়ার কীর্তি গড়তে পারেন তিনি।
সান দিয়েগোর বিপক্ষে ফ্রি-কিক থেকে করা গোলটি ছিল ইন্টার মায়ামির জার্সিতে মেসির ১০১তম গোল। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই ক্যাম্পিওনেস কাপে মেক্সিকান ক্লাব ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানের জয়ে মায়ামির হয়ে নিজের ১০০তম গোল পূর্ণ করেছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা।
অর্থাৎ, ক্লাবটির হয়ে শততম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার পরের ম্যাচেই ১০১তম গোল করে ফেললেন তিনি। মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই গোল, অ্যাসিস্ট ও ব্যক্তিগত রেকর্ডে একের পর এক নতুন অধ্যায় যোগ করছেন এই আর্জেন্টাইন।
সান দিয়েগোর বিপক্ষে তাঁর গোলটি ছিল পেশাদার ক্যারিয়ারের ৯৩০তম গোল। একই সঙ্গে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের ৭৫তম ফ্রি-কিক গোল। ম্যাচে দলের হয়ে গোল করলেও শেষ পর্যন্ত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি মায়ামি।
ম্যাচের শুরু থেকেই সান দিয়েগো এফসি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। ১২ মিনিটেই মায়ামির রক্ষণ ভেঙে গোল করে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। ডেনমার্কের তারকা ড্রেইয়ারকে দুর্দান্ত একটি থ্রু বল দিয়েছিলেন তাঁর স্বদেশি সতীর্থ ইয়েপে টোভার্সকভ।
সেই পাস ধরে মায়ামির গোলকিপার ডেন সেন্ট ক্লেয়ারের মাথার ওপর দিয়ে আলতো চিপে বল জালে পাঠান ড্রেইয়ার। এতে শুরুতেই ১-০ গোলে এগিয়ে যায় সান দিয়েগো।
গোল হজমের পর অবশ্য দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় মায়ামি। বলের দখল বাড়িয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। মেসি, লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো দে পলও আক্রমণভাগে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
ম্যাচের ২৪ মিনিটে আসে মায়ামির কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোল। ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে পাওয়া ফ্রি-কিকে অসাধারণ দক্ষতায় বল জালে পাঠান মেসি।
বাঁকানো শটটি সান দিয়েগোর দেয়াল পেরিয়ে বক্সের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ইনসাইড পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। গোলকিপারের কোনো সুযোগই ছিল না। ১-১ গোলে সমতায় ফেরে মায়ামি।
সমতায় ফেরার পর মায়ামি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মেসি, সুয়ারেজ ও দে পল একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও সান দিয়েগোর রক্ষণ ও গোলকিপার দলকে দ্বিতীয়বার গোল হজম করা থেকে রক্ষা করেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও মায়ামির আক্রমণ অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত ৭৪ মিনিটে তাদের পরিশ্রমের ফল আসে। ডি-বক্সের সামনে রদ্রিগো দে পলের চতুর পাস থেকে বল পেয়ে শক্তিশালী শটে গোল করেন লুইস সুয়ারেজ।
৩৯ বছর বয়সী উরুগুয়ের এই তারকার গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মায়ামি। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে মনে হচ্ছিল, এই গোলই হয়তো মায়ামিকে পূর্ণ তিন পয়েন্ট এনে দেবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটক জমে ওঠে ম্যাচের শেষ দিকে।
ম্যাচের শেষ দিকে আবারও মায়ামির রক্ষণে আঘাত হানে সান দিয়েগো। প্রথম গোলের মতো এবারও ড্রেইয়ারকে নিখুঁত পাস দেন টোভার্সকভ। বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং করে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন ড্রেইয়ার।
তাঁর গোলে ২-২ সমতায় ফিরে আসে সান দিয়েগো। শেষ মুহূর্তে জয়ের জন্য দুই দলই মরিয়া হয়ে ওঠে। ইনজুরি টাইমের একেবারে শেষ দিকে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে জয়ের সুবর্ণ সুযোগও পেয়ে যায় সান দিয়েগো।
তবে কিয়ারান সার্জেন্টের জোরালো শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন মায়ামির গোলকিপার ডেন সেন্ট ক্লেয়ার। তাঁর সেই সেভে নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় মায়ামি।
২-২ গোলের ড্রয়ের ফলে এমএলএসে নিজেদের শেষ নয় ম্যাচে মাত্র একটি জয় পেয়েছে ইন্টার মায়ামি। নিয়মিত মৌসুমে আর আটটি ম্যাচ বাকি থাকতেই শীর্ষে থাকা ন্যাশভিলের চেয়ে ১১ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়েছে দলটি।
ব্যক্তিগতভাবে মেসির জন্য ম্যাচটি ছিল আরেকটি স্মরণীয় রাত। ২০তম লিগ গোল, টানা তিন মৌসুমে ২০ গোলের রেকর্ড, মায়ামির হয়ে ১০১তম গোল এবং ক্যারিয়ারের ৭৫তম ফ্রি-কিক গোল—সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত অর্জনে আলো ছড়িয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
তবে তাঁর এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও শেষ পর্যন্ত মায়ামিকে এনে দিতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত জয়। ফলে ব্যক্তিগত রেকর্ডের রাতে দলীয়ভাবে আরও একবার পয়েন্ট হারানোর হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে মেসি ও তাঁর সতীর্থদের।
পড়ুন:‘বুড়োদের’ দল নিয়ে জিম্বাবুয়ের বিশ্ব রেকর্ড
ইমি/


