বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু- ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় থাকা বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে। সুনীল অর্থনীতি ও সার্কুলার ইকোনমিকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বল রুমে আয়োজিত দ্বিতীয় চীন-বাংলাদেশ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময় বিষয়ক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সম্পদ বিশাল জনগোষ্ঠী। এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের পাশাপাশি সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এই বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চলের সম্পদ ও সম্ভাবনা নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণা আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সুনীল অর্থনীতি নিয়ে চীনের গবেষক ও অধ্যাপকেরাও কাজ করছেন। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও গবেষণা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি) খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। সম্প্রতি চীন সফরে দেশটির শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি হওয়া সংযোগ দেখেছেন বলেও জানান তিনি। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। সুনীল অর্থনীতি, শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামসহ চীনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

ব্লু- ইকোনমির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি বলতে সমুদ্রের সম্পদনির্ভর অর্থনীতিকে বোঝায়। অর্থাৎ সমুদ্র থেকে আহরণ করা যেসব সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়, সেগুলোই ব্লু-ইকোনমির আওতাভুক্ত। ১৯৯৪ সালে বেলজিয়ামের অধ্যাপক গুন্টার পাউলি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে প্রথম সুনীল অর্থনীতির ধারণা দেন।

সমুদ্র পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। মৎস্যসম্পদের মাধ্যমে সমুদ্র মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে।

২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশের অধীনে এসেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা। পাশাপাশি ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৪৫ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের মধ্যে ১২টি এবং ভারতের কাছ থেকে দাবিকৃত ১০টি ব্লকের সবগুলোই পেয়েছে বাংলাদেশ। এসব ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এ দুটি রায় বাংলাদেশের জন্য ‘সমুদ্র বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

ব্লু-ইকোনমি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পাইলট কান্ট্রি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও জৈবগুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

উপকূলীয় অঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক জেলে প্রায় ৭০ হাজার যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বঙ্গোপসাগরে রয়েছে চারটি মৎস্যকেন্দ্র।

মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী, আগাছা ও লতাগুল্ম। এসব আগাছা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। স্পিরুলিনা নামের আগাছা চীন, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা হলেও বাংলাদেশ বর্তমানে আহরণ করতে পারছে মাত্র ০.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে মাছ আহরণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

বঙ্গোপসাগরে ভারী খনিজেরও সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব খনিজের মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, ম্যাগনেটাইট ও কোবাল্ট। এসব মূল্যবান সম্পদ সঠিকভাবে উত্তোলন করা গেলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের অবিচ্ছিন্ন বালুময় সমুদ্রসৈকত রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিনোদন ও মনোরম পরিবেশের ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটন খাত থেকেও আয়ের পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব।

তবে ব্লু-ইকোনমির উন্নয়নে বাংলাদেশকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত নীতিমালা ও সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, সম্পদের পরিমাণ ও মূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ঘাটতি, মেরিন রিসোর্সভিত্তিক পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব এবং ব্লু-ইকোনমি নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা। এ ছাড়া সমুদ্রে গমন ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গবেষণা জাহাজের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিস্তৃত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রের সম্ভাবনা ও সম্পদ চিহ্নিতকরণ, সেগুলোর পরিমাণ নির্ধারণ এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথাযথ ব্যবহারের পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দূষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার জন্য সরকার ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এর ফলে দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে সহযোগিতা ও গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষ জনবল তৈরি হবে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশকে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

পরিকল্পিতভাবে সুনীল অর্থনীতিকেন্দ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে যথাযথ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।

পড়ুন : বিপিসির লোকসান ও পাচার ঠেকাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন