এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে তিন মাসব্যাপী বিশেষ ‘ডিজিটাল সচেতনতা ক্যাম্পেইন’ শুরু হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান এ উদ্যোগে সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বার্তায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ বা কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে ড. মুহিত বলেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সময়োপযোগী তথ্যের প্রচারই পারে ডেঙ্গুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে।
এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতামূলক কনটেন্ট, রিলস ও স্টোরি আপলোড এবং তা শেয়ারের মাধ্যমে ব্যাপক ক্যাম্পেইনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এরই মধ্যে ডেঙ্গু সচেতনতা ক্যাম্পেইনে বেশ কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর যুক্ত হয়েছেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ড. মুহিত বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়, জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা এবং ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মতো জরুরি তথ্য কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সৃজনশীল ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক ও পোস্টের মাধ্যমে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে সবাই এই জাতীয় উদ্যোগে ভূমিকা রাখতে পারেন।
আগামী তিন মাসের এই ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ডেঙ্গুর লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি, আঙিনা ও কর্মক্ষেত্র পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সচেতনতামূলক বার্তা ভার্চুয়াল পরিসরেও ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ভারতে ডেঙ্গুর টিকা কবে আসছে
ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চালুর পথে ভারত। দেশটিতে প্রথমবারের মতো অনুমোদিত ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ আগামী বছরের প্রথমার্ধে বাজারে আসতে পারে।
জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি এ টিকা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর বেসরকারি বাজারে টিকাটি আনতে তাকেদার সঙ্গে চুক্তি করেছে ড. রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজ।
চুক্তি অনুযায়ী, কিউডেঙ্গার প্রচার ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়োজনীয় স্থানীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে টিকাটি পাওয়া যেতে পারে।
কিউডেঙ্গা কী
কিউডেঙ্গা চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি জীবিত কিন্তু দুর্বল করা ভাইরাসভিত্তিক একটি টিকা। চার থেকে ৬০ বছর বয়সী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি অনুমোদিত হয়েছে।
টিকাটি দুই ডোজে দিতে হয়। প্রথম ডোজের তিন মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, টিকা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
কিউডেঙ্গার কার্যকারিতা
কিউডেঙ্গার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া ঠেকাতে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা পাওয়া গেছে। ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ডোজের এক বছর পর নিশ্চিত ডেঙ্গু সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকাটির কার্যকারিতা ছিল ৮০ দশমিক ২ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজের ১৮ মাস পর ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা পাওয়া যায় ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে এসব ফল নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া জনগোষ্ঠীর ওপর পাওয়া। বাস্তব জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে টিকার কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে।
ভারতে কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারতে ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ভারতের সরকারি প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫০টি ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা এবং ৯৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে টিকা চালু হলে মশা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি ডেঙ্গু মোকাবিলায় এটি আরও একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কিউডেঙ্গা
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, কিউডেঙ্গা ইতোমধ্যে বিশ্বের ৪৩টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে এবং ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে টিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
ভারতে শুরুতে কিউডেঙ্গা বেসরকারি বাজারের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। তাকেদা জানিয়েছে, ভারতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখার পাশাপাশি টিকার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ১০ কোটি ডোজ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ১ কোটি ৪৪ লাখ ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা এবং ১১ হাজার ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৪২৫ এবং মৃত্যু ২৩৩ জন।
তবে কিউডেঙ্গা বাজারে এলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার মতো প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোর গুরুত্ব কমবে না।
পড়ুন : জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী
সা/


