যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নজর থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বেড়েছে। কয়েক দফা দরপতনের পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরার মধ্যেই মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ০০:২১ জিএমটি পর্যন্ত নভেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ২২ সেন্ট বা ০.২২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০.৫৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ৮টার দিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৬৯ ডলারে নেমে যায়।
এদিকে, অক্টোবর সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের চুক্তির দাম ২ সেন্ট বা ০.০২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫.৮০ ডলারে লেনদেন হয়েছে। মঙ্গলবারই এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাজারে বেশি সক্রিয় নভেম্বর সরবরাহের ডব্লিউটিআই চুক্তির দাম ১৩ সেন্ট বা ০.১৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯২.৪৯ ডলারে পৌঁছেছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর রাখছে বাজার। সম্ভাব্য আলোচনা কিংবা উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও পাইপলাইনে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এবং হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।
তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া ও শিপিং খরচ বাড়ায় ফ্রেইট ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি আমদানিতে সামগ্রিক ফ্রেইট চার্জ ও সাপ্লাই চেইন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে।
অন্যদিকে বৈদেশিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতাও তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে।
এর আগে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। শনিবার ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে—এমন সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন সেদিকেই নজর রাখছেন। এর প্রভাবেই সোমবার তেলের দাম কমেছে।
জ্বালানি তেল সাধারণত দুইভাবে বিক্রি হয়। একটি স্পট মার্কেট, যেখানে তাৎক্ষণিকভাবে তেল কেনা যায় এবং দাম কিছুটা বেশি পড়ে। অন্যটি আগাম কেনাবেচার বাজার, যাকে ফিউচার বলা হয়।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। এর কয়েক দিন আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর, তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল।
এ ছাড়া অক্টোবর মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের ফিউচার দরও ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৯ ডলারে নেমেছে।
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকেরা ১৮ সেপ্টেম্বর এক নোটে বলেছেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেশ ভালো পরিমাণে তেল সরবরাহ হচ্ছে। বিষয়টি আশ্চর্যজনক বলে অভিহিত করেছেন তাঁরা। গত ১০ দিনে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের গড়ের তুলনায় তা দৈনিক ৬১ লাখ ব্যারেল কম।
তবে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কেটে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের বিষয়ে তিনি হয়তো শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন। অদূর ভবিষ্যতে ‘খুব বড় কিছু’ ঘটতে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো, কখন। আর যদি কাজটা করতেই হয়, তাহলে পুরো দেশটা উড়িয়ে দেব কি না। তাদের ঠিকমতো আচরণ করতে হবে।’
স্কাই লিংকস ক্যাপিটাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যানিয়েল তাকিয়েদ্দিন মনে করেন, মূলত রপ্তানি কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কূটনৈতিক অগ্রগতি কতটা হয়, তেলের দাম তার ওপর নির্ভর করবে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে বা জাহাজ চলাচলে নতুন করে ঝামেলা হলে বাজারে তেলের সরবরাহ আরও কমবে। এতে তেলের দাম আবার বাড়তে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর থেকে তেলের দাম ওঠানামা করছে। তবে এখনো ১০০ ডলারের নিচে নামেনি।
এর মধ্যে ১৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ১০৯ ডলারে ওঠে। পরদিন, অর্থাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর, এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে আসে ১০৪ ডলারে। এরপর সোমবার তেলের দাম আরও কমে ১০১ ডলারে দাঁড়ায়।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ১ মার্চ বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ৭২ ডলার। ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে।
যুদ্ধবিরতি শুরু হলে তেলের দাম কমতে কমতে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এরপর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিলে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করে। তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও তেলের দাম যতটা বাড়তে পারত, ততটা বাড়েনি।
তেলের চাহিদা কমছে
তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যেও তেলের দাম প্রত্যাশার তুলনায় বেশি না বাড়ার মূল কারণ হিসেবে তেলের চাহিদা কমে যাওয়াকে দেখা হচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অনেক দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে চীনে এই প্রবণতা স্পষ্ট।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাডের হিসাবে, পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন জ্বালানিতে তেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ৩৫ লাখ ব্যারেল কমেছে।
চাহিদা কমার অর্ধেকের বেশি চীনের ক্ষেত্রে হয়েছে। দেশটিতে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের প্রসার ঘটছে। ফলে তেলনির্ভর জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যালের চাহিদা কমছে।
পড়ুন : ইয়েমেনে সৌদির বিমান হামলায় নিহত ৬
সা/


