ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সীমিত সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করবে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ)। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরএএফ ভয়েজার ট্যাংকার বিমান মোতায়েনের মাধ্যমে এই সহায়তা শুরু হবে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাওয়ার পথে বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম। তিনি জানান, সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সকে অনুমতি দিয়েছেন তিনি।
বার্নহাম আরও জানান, এই সহায়তা সাময়িকভাবে কয়েক সপ্তাহের জন্য দেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযান শুরু হবে। এ জন্য একটি আরএএফ ভয়েজার ট্যাংকার বিমান মোতায়েন করা হবে। বিমানটি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অভিযানে থাকা সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করবে।
বার্নহাম বলেন, ‘আমি ব্রিটেন ও বৃহত্তর অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছি। কারণ সৌদি আরব হামলার শিকার হচ্ছে, সামনে আরও অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো খোলা রাখতে হবে।’
এদিকে ইয়েমেনে আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। হুতিরা সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। গত শনিবার রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়। তবে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করে।
হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ যে সমুদ্রপথ দিয়ে যায়, সেই গুরুত্বপূর্ণ রুটে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজ ও দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করছে তারা।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আরও অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বন্দরনগরী মোকা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ দখল করে হুতিরা। এতে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ওপর গোষ্ঠীটির নজরদারির সক্ষমতা আরও বেড়েছে।
হুতিদের এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে লন্ডন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য বলেছে, ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ’ করবে তারা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি হামলা চালালেও সর্বশেষ উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটন সামরিকভাবে হস্তক্ষেপে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
এ অবস্থায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চাওয়ার খবরের পরই যুক্তরাজ্য এই সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটেনের পাশাপাশি ফ্রান্স, মিশর ও পাকিস্তানের কাছেও সৌদি আরব সহায়তা চেয়েছে বলে জানা গেছে।
লোহিত সাগর ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ সচল রাখা এবং যুক্তরাজ্যের নিজস্ব ও আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই যুক্তরাজ্য সৌদি আরবকে সীমিত সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
বাণিজ্যপথ সচল রাখা: ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালী এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই পথটি ইউরোপে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান সামুদ্রিক রুট।
অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো: এই বাণিজ্যপথ বন্ধ বা ব্যাহত হলে যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদির নিরাপত্তা রক্ষা: হুতিরা সৌদির রাজধানী রিয়াদ এবং তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। তাই সৌদি আকাশসীমা সুরক্ষায় তাদের যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি (এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং) সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এই সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়ে এর সময়সীমা এবং চলমান পরিস্থিতির রূপরেখা স্পষ্ট করেছেন।
সীমিত সময়সীমা: ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই অভিযানটি সম্পূর্ণ সময়-সীমিত (Time-limited)। প্রাথমিকভাবে এই সহায়তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
নির্দিষ্ট মিশন: সাইপ্রাসের আরএএফ আকিনোটিরি বিমানঘাঁটি থেকে রাজকীয় বিমান বাহিনীর (RAF) একটিমাত্র ভয়েজার ট্যাঙ্কার বিমান (Voyager aircraft) এই মিশনে অংশ নেবে। এটি কেবল সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহ (এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং) করবে, কোনো সরাসরি হামলায় অংশ নেবে না।
হুতিদের সঙ্গে বর্তমান সংঘাতের পরিস্থিতি
হুতিদের বড় ধরনের আগ্রাসন: সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা তীব্র অভিযান চালিয়ে দেশটির সমগ্র লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ বাব আল-মান্দাব প্রণালী এখন সম্পূর্ণ তাদের হুমকির মুখে পড়েছে।
সৌদির ওপর সরাসরি আঘাত: দীর্ঘ কয়েক বছর পর গত শনিবারে হুতিরা সৌদির রাজধানী রিয়াদে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা এই সংঘাতকে এক নতুন ও মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এছাড়া সৌদির তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোগুলোও তাদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ: হুতিদের এই অবরোধ ও হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার এবং জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ার তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যামের মতে, এই সংঘাতের ফলে যেন ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির (Cost-of-living) বাড়তি চাপ না আসে, সেজন্যই তারা সৌদির আকাশসীমা রক্ষায় এই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন।
পড়ুন : টাইফুন দুজুয়ানে বিপর্যস্ত জাপান, বাতিল শত শত ফ্লাইট ও রেল চলাচল বন্ধ
সা/


