বিজ্ঞাপন

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভূমিধস জয় পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়ার

বিজ্ঞাপন

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে।

স্টেট দুমায় মোট আসন রয়েছে ৪৫০টি। এর মধ্যে ৩৫০টি আসনেই জয় পেয়েছেন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির প্রার্থীরা।

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিন দুমা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করে রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে দেশটির মোট ভোটারের ৫৯ দশমিক ৩২ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। গণনা করা মোট ভোটের মধ্যে ৫৮ শতাংশেরও বেশি পেয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি।

২০০১ সালের নির্বাচনে জয় দিয়ে স্টেট দুমায় ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির শাসনের শুরু। এরপর টানা ২৫ বছর ধরে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছে দলটি। প্রতি পাঁচ বছর পর দুমার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনসহ গত ২৫ বছরে মোট পাঁচটি নির্বাচন হয়েছে এবং প্রতিবারই জয় পেয়েছে পুতিনের রাজনৈতিক দল। তবে এবারের মতো এত বড় ব্যবধানে জয় বা এত বেশি ভোট পাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার মস্কো প্রতিনিধি দিমিত্রি মেদভেদেঙ্কো বলেছেন, “এই ফলাফল এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের বিপুল অংশগ্রহণকে মস্কো সম্ভবত তাদের কর্মকাণ্ডের—বিশেষ করে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের পদক্ষেপের প্রতি জনসমর্থন হিসেবে এবং নিজেদের অবস্থানকে আরও জোরদার করার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখবে।”

এর আগে স্টেট দুমার সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় এবারই প্রথম স্টেট দুমার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারপারসন এল্লা পামফিলোভা জানিয়েছেন, ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির পর নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি। দলটি ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে স্টেট দুমার ৪০টি আসনে জয় পেয়েছে। এছাড়া জাতীয়তাবাদী এলডিপিআর ২৫টি এবং নিউ পিপল পার্টি ২০টি আসনে জয়ী হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল ইয়াবোলোকোও এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে দলটির কোনো প্রার্থীই জয় পাননি।

নির্বাচনের ফলাফলে সাধারণ রুশ নাগরিকদের অনেকেই বিস্মিত হননি। তাদের অনেকে জানিয়েছেন, ফলাফল এমনই হবে বলে তারা প্রত্যাশা করেছিলেন।

মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানা আলজাজিরাকে বলেন, “সকাল বেলা আমি টেলিভিশন খুলে দেখলাম যে ইউনাইটেড রাশিয়া নির্বাচনে জিততে চলেছে। আমি অবাক হইনি এবং আমার ধারণা রাশিয়ার কেউই তেমন অবাক হয়নি।”

সামনে কোনো পরিবর্তন দেখতে চান কি না— প্রশ্নের উত্তরে তাতিয়ানা বলেন, “আমার মনে হয় আমরা সবাই মূল সংকটটি জানি, আর সেটি হলো ইউক্রেনে সংঘাত। আমি চাই, যদি সুযোগ থাকে কিংবা যদি সম্ভব হয়— শান্তিপূর্ণ উপায়ে যত শিগগির সম্ভব এই সংঘাত থামানো।

রাশিয়ার নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ এই দলটি ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে তাঁর নীতিরও সমর্থক।

তবে এবারের নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে অন্য একটি বিষয়। নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই ফলাফলকে সামনে রেখে পুতিন সরকার পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়।

২০২১ সালের পর এটিই রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। একই সঙ্গে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

বিরোধীদের জায়গা সীমিত

গত কয়েক বছরে রাশিয়ায় ক্রেমলিনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানানো দল ইয়াবলোকোকেও এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

ভোটের আগে পুতিন বলেছিলেন, এই নির্বাচন রাশিয়ার জাতীয় ঐক্যের চিত্র তুলে ধরবে। তিনি আরও বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষ আমাদের যোদ্ধাদের সমর্থন করছেন।’

এ কারণে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ক্রেমলিনের মধ্যে বড় কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না।

যুদ্ধের মধ্যেও স্বাভাবিকতার বার্তা

ইউক্রেনে যুদ্ধ চলার মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেছে রাশিয়া। এর মাধ্যমে যুদ্ধের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে—এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে দেশটি।

রাশিয়ার ১১টি সময় অঞ্চলে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউক্রেনের যেসব এলাকা রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেগুলোকে রাশিয়া নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে বলে দাবি করে, সেখানেও ভোট নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের মাধ্যমে রাশিয়ার সামনে আরেকটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—যুদ্ধ চললেও দেশটিতে নির্বাচন হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টিতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইউক্রেনে সামরিক আইন চলার সময়ে নির্বাচন না করার সাংবিধানিক বিধানের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প।

মানুষের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব বাড়ছে

রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে এর প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনেও ক্রমেই বেশি অনুভূত হচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে।

এর পাশাপাশি ইউক্রেনের ড্রোন হামলাও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের সময় মস্কো অঞ্চলেও বড় ধরনের ড্রোন হামলা হয়েছে।

এর মধ্যেও রুশ সরকার সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চাইছে, যুদ্ধের কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।

তবে যুদ্ধের চাপ বাড়তে থাকলে এই বার্তা ধরে রাখা ক্রেমলিনের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কা

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাশিয়া নতুন করে সেনা সমাবেশ করতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া আংশিক সেনা সমাবেশ করেছিল। ওই সময় প্রায় তিন লাখ পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের পর রাশিয়ায় ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। অনেক রুশ নাগরিক সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এড়াতে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন।

পরবর্তী সময়ে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়, ফলে দেশ ছাড়ার সুযোগও সীমিত হয়ে আসে।

তবে রুশ সরকার নতুন করে সাধারণ সেনা সমাবেশের কোনো পরিকল্পনা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। পুতিনও এমন পরিকল্পনার কথা নাকচ করেছেন।

তিনি এ ধরনের আলোচনা ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘তথ্য আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।

যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনারা পার্লামেন্টে

এবারের নির্বাচনে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৪৯ জন সাবেক সেনাসদস্য পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের রাজনৈতিক পদ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এটি সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দেওয়ার আগ্রহ বাড়াতেও ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বয়সী কিছু রুশ নাগরিক এখনো উদ্বিগ্ন। তাদের কেউ কেউ নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কায় দেশ ছাড়ছেন। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধের জন্য আরও সেনার প্রয়োজন হলে সরকার আবারও সেনা সমাবেশের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

নির্বাচনের পর কী করবে ক্রেমলিন?

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফল পুতিন সরকারকে নতুন করে রাজনৈতিক সমর্থনের দাবি করার সুযোগ দিতে পারে। এরপর ইউক্রেনে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

দেশের ভেতরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

নির্বাচনের পর ক্রেমলিন কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

পড়ুন : টাইফুন দুজুয়ানে বিপর্যস্ত জাপান, বাতিল শত শত ফ্লাইট  ও রেল চলাচল বন্ধ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন