ঝিনাইদহের শৈলকুপায় সাপের দংশণে মরিয়ম(৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি মঙ্গলবার ভোরে উপজেলার হরিহরা গ্রামে। চিকিৎসার জন্য মরিয়মকে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে এ্যান্টিভেনম দেওয়ার মাঝে তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসক জানান।
মরিয়মের নানী রুপালী বেগম জানান, মায়ের সাথে মরিয়ম নানী বাড়িতে কয়েকদিন আগে এসেছিল। মরিয়ম ও তার মা এক বিছানায় ঘুমিয়েছিল। ভোরে সে তার মাকে বলে, মা তুমি কি আমাকে কামড়াইছো। তখন সে মুখ থেকে লালা ফেলতে থাকে। অসুস্থ্যতা বোধ করলে মঙ্গলবার ভোরে সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তার তাকে চিকিৎসা দেয়। কিন্ত সে মারা যায়।
জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডা. এহেতেশাম শহিদ বলেন ভোরে মরিয়মকে হাসপাতালে আনা হয় শেষ মুহুর্তে। তার শরীরে কালাচ সাপের দুটি বাইট তারা লক্ষ্য করেন। রোগীকে এ্যন্টিভেনম দেওয়া হয়। কিন্ত চিকিৎসার মাঝ পথে তার মৃত্যু হয় বলে জানান।
সাপে কাটলে কী করবেন, কী করবেন না
প্রতি বছর বাংলাদেশে সাপের কামড়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা বেশি। বিষধর সাপের কামড়ে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে সচেতনতার অভাব, সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া এবং চিকিৎসা নিতে বিলম্বকে উল্লেখ করা হয়।
এখনো অনেক গ্রামে সাপে কাটলে ওঝা বা বেদের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো কুসংস্কার রয়েছে। সাপে কাটার পর বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে চিকিৎসা নিতে হবে, সে সম্পর্কেও অনেকের সঠিক ধারণা নেই। ফলে সময়মতো চিকিৎসা পেলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জি কে এম শহীদুজ্জামানের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক, সাপে কাটলে কী করবেন এবং কী করবেন না।
সাপে কাটলে যা করবেন
আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার আশ্বস্ত করতে হবে এবং সাহস দিতে হবে। কোনোভাবেই তাকে আতঙ্কিত হতে দেওয়া যাবে না। নির্বিষ সাপের কামড়েও আতঙ্কিত হয়ে মানসিক আঘাতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বাংলাদেশে অধিকাংশ সাপই বিষহীন এবং অল্প কিছু সাপ বিষধর। আবার বিষধর সাপও অনেক সময় পর্যাপ্ত বিষ ঢোকাতে ব্যর্থ হতে পারে। এসব বিষয় জানিয়ে রোগীকে আশ্বস্ত করা যেতে পারে।
কামড়ানো অঙ্গ স্থির রাখতে হবে। হাতে কামড়ালে হাত নাড়ানো যাবে না। পায়ে কামড়ালে হাঁটাচলা না করে স্থির হয়ে বসতে হবে।
আক্রান্ত অঙ্গ ব্যান্ডেজ দিয়ে কিছুটা চাপ প্রয়োগ করে পেঁচাতে হবে। এটিকে প্রেসার ইমোবিলাইজেশন বলা হয়। ব্যান্ডেজ না পাওয়া গেলে গামছা, ওড়না বা এ ধরনের কিছু ব্যবহার করা যেতে পারে।
কামড়ের স্থান সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে হবে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে হালকাভাবে মুছে দিতে হবে।
হাত-পায়ে ঘড়ি, অলঙ্কার, তাবিজ, তাগা বা এ ধরনের কিছু থাকলে তা খুলে ফেলতে হবে।
রোগীকে আধশোয়া অবস্থায় রাখতে হবে। শ্বাস না নিলে তাকে মুখে শ্বাস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
সাপটিকে যদি ইতোমধ্যে মেরে ফেলা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি হাসপাতালে নিয়ে আসা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই হাতে ধরে সাপটি বহন করা যাবে না। কিছু সাপ মরার ভান করতে পারে। একই সঙ্গে সাপ মারতে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বিষ প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম কাছাকাছি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
সাপে কাটলে যা করবেন না
সাপে কাটার পর না জেনে অনেক সময় এমন কিছু করা হয়, যা রোগীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
কোনো ধরনের শক্ত বাঁধন বা গিঁট দেওয়া যাবে না। সাধারণত হাত বা পায়ে কামড়ালে ক্ষতস্থানের ওপরের দিকে দড়ি বা এ ধরনের কিছু দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, যাতে বিষ ছড়িয়ে পড়তে না পারে। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। বরং এতে হাত বা পায়ে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে। রক্ত প্রবাহের অভাবে টিস্যুতে পচন (Necrosis) শুরু হতে পারে।
চিকিৎসার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
কামড়ের স্থানে ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটাকাটি করা যাবে না।
অনেকের ধারণা, আক্রান্ত স্থানে মুখ লাগিয়ে বিষ চুষে বের করলে রোগী সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু বিষ রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা এভাবে বের করা সম্ভব নয়। তাই কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত স্থানে মুখ দেওয়া যাবে না।
আক্রান্ত স্থানে কোনো ভেষজ ওষুধ, লালা, পাথর, উদ্ভিদের বীজ, গোবর, কাদা বা এ ধরনের কিছু লাগানো যাবে না।
কোনো রাসায়নিক পদার্থ লাগানো বা তা দিয়ে সেঁক দেওয়া যাবে না।
আক্রান্ত ব্যক্তির গিলতে বা কথা বলতে সমস্যা হলে, বমি, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, নাসিক কণ্ঠস্বর ইত্যাদি দেখা দিলে তাকে কিছু খাওয়ানো যাবে না। একইভাবে কিছু খাইয়ে বমি করানোর চেষ্টাও করা যাবে না।
ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।
পড়ুন : দুর্গাপুরে পূর্বশত্রুতার জেরে পুকুরে বিষপ্রয়োগ, লাখ টাকার মাছ নিধন
সা/


