কিছু কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। সময়ের সীমানা পেরিয়ে সেসব দিন জায়গা করে নেয় একটি জাতির হৃদয়ে, ইতিহাসের গভীরে এবং মানুষের আবেগের মণিকোঠায়। কিছু তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংগ্রাম, সাহস, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গল্প।
৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত, তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঘটনাবহুল একটি অধ্যায়।
সময়ের স্রোতে কত সরকার এসেছে, কত সরকার বিদায় নিয়েছে। কত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, কত ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। ইতিহাসের অনেক পরিচিত মুখ আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে ফিরে আসে। কারণ, এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা, সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক সংহতি এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। অসংখ্য মা-বোনের আত্মত্যাগ, মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস এবং কোটি মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই স্বাধীনতার যুদ্ধে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, যাঁরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, যাঁরা সংগঠিত করেছেন প্রতিরোধ, তাঁদের প্রত্যেকের অবদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন দেশের মানুষ দিশেহারা। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত মানুষ নতুন সাহস ও প্রেরণা পায়।
তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দেন এবং পরবর্তী সময়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
স্বাধীনতার ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের এই অবদান কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পথচলা সহজ হয়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, খাদ্যসংকট এবং নানা ধরনের সংকট নতুন রাষ্ট্রকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল সেনাসদস্যের অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। জাতি গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এরপর রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের চার জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
দেশ তখন এক গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে সর্বত্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
এমন এক অস্থির পরিস্থিতিতে আসে ৭ নভেম্বর।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন স্থানে সেনাসদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। সৈনিকদের একটি অংশ বিদ্রোহে অংশ নেয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তাঁকে ঘিরে সমর্থন তৈরি হয়। ঢাকার রাজপথেও সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
৭ নভেম্বরের তাৎপর্য বুঝতে হলে সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানুষের প্রত্যাশাকে উপলব্ধি করতে হবে। দীর্ঘ অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত একটি দেশের মানুষ তখন স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চেয়েছিল। জিয়াউর রহমানের মুক্তিকে কেন্দ্র করে সৈনিকদের মধ্যে যে সমর্থন তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের যে অংশগ্রহণ দেখা যায়, তা সে সময়ের জনমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
জিয়াউর রহমানের প্রতি এই সমর্থনের পেছনে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিচয়, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের ভূমিকা ছিল বলে বিবেচনা করা হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়ক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশ আবার স্থিতিশীলতার পথে ফিরবে—এমন প্রত্যাশাও অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।
৭ নভেম্বরের পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনসম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক।
বিশেষ করে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে তাঁর উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার যে চিন্তা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা ছিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
তাঁর সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সম্প্রসারিত হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু দেশকে আবারও শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি বেদনাবিধুর অধ্যায়।
তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অটুট রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তি, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে ৭ নভেম্বরের ইতিহাসে কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের রাজনৈতিক ও সামরিক পথ আলাদা হয়ে যায়। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই সামরিক আদালতে বিচারের পর কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ৭ নভেম্বর ছিল বহুমাত্রিক ঘটনাপ্রবাহের একটি দিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সৈনিকদের ক্ষোভ, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা।
তবে আমার কাছে ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার পথে তাঁর ভূমিকা এই দিনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
৭ নভেম্বর আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রেখে যায়—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোথায়? ক্ষমতায়, নাকি জনগণের আস্থায়? অস্ত্রে, নাকি মানুষের ভালোবাসা ও ঐক্যে?
আমার বিশ্বাস, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার জনগণ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সার্থকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে পারে এবং দেশের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আজকের বাংলাদেশেও ৭ নভেম্বরের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ চায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি। তরুণরা চায় যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান। কৃষক চান উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য। শ্রমিক চান সম্মানজনক মজুরি। সাংবাদিক চান স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশের পরিবেশ। সাধারণ মানুষ চান রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি।
মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
জাতীয় সংহতি মানে শুধু একটি দিবসে মিছিল, সমাবেশ কিংবা ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় নয়। সংহতি মানে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কথা বলা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং দেশের স্বার্থে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সব বীর, জাতীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকেও সম্মান করতে হবে। ইতিহাসের কোনো একটি অংশকে আড়াল করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ সম্ভব নয়।
আমরা চাই, জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, সাহসিকতা, কর্মমুখী নেতৃত্ব এবং গ্রামীণ উন্নয়নের চিন্তা থেকে নতুন প্রজন্ম অনুপ্রেরণা গ্রহণ করুক। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা হোক। তাঁর জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষা গ্রহণ করুক।
২০২৬ সালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পুনরায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালনের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘ বিরতির পর দিবসটির আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন ইতিহাসের এই অধ্যায়কে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে একটি দিবসের প্রকৃত মর্যাদা শুধু সরকারি স্বীকৃতি কিংবা ছুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় যখন সেই দিবসের শিক্ষা রাষ্ট্র ও সমাজের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, প্রতিযোগিতা হবে উন্নয়ন ও জনকল্যাণে। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষের অধিকার বড় হবে। যেখানে সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করতে পারবেন, তরুণরা স্বপ্ন দেখতে পারবেন, কৃষক-শ্রমিক তাঁদের শ্রমের মর্যাদা পাবেন এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাবেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের একার নয়। এই দেশ কৃষকের, শ্রমিকের, শিক্ষকের, সাংবাদিকের, শিক্ষার্থীর, প্রবাসীর এবং এ দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের। এই দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের সবার।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের মুখ বদলে যায়, রাজনৈতিক পরিচয় বদলে যায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের মূল্য কখনো ফুরিয়ে যায় না।
তাই ৭ নভেম্বরকে শুধু অতীতের একটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখতে চাই। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দিক, স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করাও আমাদের বড় দায়িত্ব।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অবদান, স্বাধীনতার ঘোষণা, নেতৃত্ব এবং দেশ গঠনের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও কর্মের ইতিবাচক দিকগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
কারণ, যে মানুষটি একাত্তরে স্বাধীনতার আহ্বান নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর অবদানকে যথাযথভাবে স্মরণ করা ইতিহাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই অংশ।
৭ নভেম্বরের এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা—অতীতের গৌরব থেকে শক্তি নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক আগামীর পথে। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে জাতীয় স্বার্থে সবাই এক হই। দেশপ্রেম হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সময়ের স্রোতে ৭ নভেম্বর ফিরে আসুক বারবার, আর আমাদের হৃদয়ে অমলিন থাকুক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি ও প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
পড়ুন : ৭ নভেম্বরের চেতনায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


