বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও কমেছে। সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইনে তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু করায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের আশাও বাজারে স্বস্তি ফিরিয়েছে। এর প্রভাবে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দাম কমেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ সেন্ট বা দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ১৮ সেন্টে নেমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৫ সেন্ট বা দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে। ফলে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই তেল বিক্রি হচ্ছে ৯০ ডলার ১৭ সেন্টে।
লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইনে সৌদি আরব পুনরায় অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলায় সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেয়ার’ হুমকি দেন। একই সময়ে তিনি জানান, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে তার দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, তাদের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।’
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা এবং প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানের উদ্যোগে আশাবাদ তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। গত ৮ সেপ্টেম্বরের পর ওই দিনই প্রথমবার ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজারে বেশি আশাবাদ তৈরি হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের বৈঠক ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। ‘ধ্বংস করে দেয়ার’ হুমকিসহ কঠোর বক্তব্য অব্যাহত থাকলেও বাজার এখন আলোচনার সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিচ্ছে।’
এদিকে মঙ্গলবার সৌদি আরব লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে আবারও কার্যক্রম শুরু করেছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইরাকের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলার পর গত ১১ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দেশটির ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল তোলা বন্ধ হয়ে যায়।
সৌদি আরব পাইপলাইনটি পুনরায় সক্রিয় করায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরের দিকে পাঠানো হচ্ছে, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে ইরাকও তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে বলে দেশটির তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ মঙ্গলবার জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরাক প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করছে। তুরস্কের মাধ্যমে প্রতিদিন ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করার আশাও প্রকাশ করেছে দেশটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সুবিধা নিতে পারে না কেন বাংলাদেশ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও দাম বাড়তে দেখা যায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যায় না—দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ করে আসছেন ক্রেতারা। বিভিন্ন সময়ে সামনে আসা তথ্য-প্রমাণেও তাদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয় বলে দেখা গেছে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর গত সাত মাসে তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়েছে। এ দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে দাম বাড়ানোর সময় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম আগের তুলনায় আট মার্কিন ডলার কমে ১০১ ডলারে নেমেছিল।
প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পরও বাংলাদেশে এর প্রভাব সেভাবে দেখা যায় না কেন? আর কোন প্রক্রিয়ায় ও কী বিবেচনায় দেশের বাজারে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়?
দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। আমদানিকারক দেশগুলো তেল কেনার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের বাজারে সেটির সরবরাহ বা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে।
খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম নির্ধারণে বিশ্বজুড়ে প্রধানত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এগুলো হলো—মূল্য সমন্বয়, সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ এবং একদর পদ্ধতি।
বেশিরভাগ দেশেই ‘মার্কেট ডিটারমাইন্ড’ বা বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের প্রতি লিটারের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আবার কিছু দেশে ‘প্রাইস সিলিং’ বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
কিছু দেশে ফিক্সড প্রাইস বা একদর পদ্ধতিও রয়েছে। এ ব্যবস্থায় সরকার তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয় এবং তা হঠাৎ পরিবর্তনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগ পর্যন্ত একদর পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতো। এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে।
আইন অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর আগে বিইআরসিকে প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে গণশুনানি করতে হতো। সেখানে যুক্তি-তর্কের পর একটি দাম নির্ধারণ করা হতো।
তবে তেলের দাম মূলত নির্ভর করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশেও তা বাড়ানো হয়, আবার দাম কমলে দেশের বাজারেও কমানোর নজির রয়েছে।
তবে বিভিন্ন সময়ে দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, পরবর্তীতে সেভাবে কমতে দেখা যায়নি।
এর একটি উদাহরণ ২০২২ সালের ৫ আগস্ট। ওই রাতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা এবং পেট্রলের দাম ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়।
সে সময় বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৫ ডলারে নেমে এসেছিল। এর কয়েক সপ্তাহ আগে দাম উঠেছিল ১২৯ ডলার পর্যন্ত। দাম বাড়ানোর প্রায় তিন সপ্তাহ পর সব ধরনের তেলের দাম লিটারে মাত্র পাঁচ টাকা কমানো হয়েছিল।
এরপর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও কমে এলেও দেশের বাজারে তেলের দাম সেভাবে কমানো হয়নি।
এখন নির্ধারিত হচ্ছে কীভাবে?
২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ার পর নতুন অধ্যাদেশ জারি করে বিইআরসি আইন সংশোধন করা হয়।
‘বিশেষ পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে নেয়। একইসঙ্গে গণশুনানির পরিবর্তে সমন্বিত মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করা হয়। মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে তখন এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে এ পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আবারও বিইআরসির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে বিইআরসির প্রবিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে বলেও জানানো হয়।
“প্রবিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ২০২৫ সালে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনও অনুমোদন পায়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
ফলে বাস্তবে ফার্নেস ওয়েল ও জেট ফুয়েল ছাড়া অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম এখনও সরকারের নির্বাহী আদেশেই নির্ধারণ করা হচ্ছে।
গত দুই বছর স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও সর্বশেষ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সেটিও মানা হয়নি।
যেভাবে বাড়ে তেলের দাম
বাংলাদেশ সরকার বিদেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। তেল কেনা থেকে দেশে আনা, পরিশোধনাগারে পাঠানো এবং পরিশোধনের পর বাজারজাত করা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের ব্যয় হয়।
“এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো খাত আছে, যেগুলো খুবই অযৌক্তিক ব্যয়। অথচ সেই খরচের ভার পুরোটাই এসে পড়ে ক্রেতা সাধারণের ঘাড়ে,” বলছিলেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়টিকে ‘মূল্য সমন্বয়’ হিসেবে উল্লেখ করে। এই মূল্য সমন্বয়ের জন্য ২০২৪ সালে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সংশোধনের পর ২০২৫ সালের মে মাসে সেটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়।
‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেল কেনার পর জাহাজে দেশে আনা, পরিবহন, পরিশোধন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মুনাফা এবং পাম্প মালিক ও ডিলারদের কমিশনসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়।
এছাড়া অকটেন ও পেট্রল ব্যক্তিগত যানবাহনে বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলোকে বিলাসদ্রব্য হিসেবে বিবেচনা করে ডিজেলের তুলনায় কিছুটা বেশি দাম রাখা হয়।
এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনার দামের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বেশি দেখা যায়।
“কিন্তু তেল আমদানির পর থেকে বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপ করা হয়, সেটি তুলে নিয়ে এবং সরবরাহ পর্যায়ে জ্বালানির চুরি ও অপচয় ঠেকানো সম্ভব হলে তেলের দাম অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব,” বলেন অধ্যাপক আলম।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যে মুনাফা নেয়, সেটিরও সমালোচনা করেন ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা।
“সরকার বলছে, জ্বালানি তেলে তারা ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার অন্যদিকে, ভ্যাট-ট্যাক্স বসাচ্ছে, বিপিসিকে মুনাফা নিতে দেওয়া হচ্ছে- এমন দ্বৈত নীতি কেন? এটা বন্ধ করা উচিৎ,” বলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
বিপিসির মুনাফার অর্থের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে
“যেমন-করোনা মহামারির আগে পাঁচ বছরে বিপিসি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল। পরে যখন সেটার হিসাব চাওয়া হলো, তখন তারা বললো যে, করোনা মহামারির ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে,” বলছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
“কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জ্বালানিখাতের টাকা তারা অন্য কাজে ব্যয় করবে কেন? ওই টাকা দিয়ে যদি তখন তেল কিনে রাখা হতো বা জমানোও থাকতো, তাহলে তো এখন সেটা কাজে আসতো। বিপিসিকে অর্থের জন্য হাহাকার করতে হতো না,” যোগ করেন অধ্যাপক হোসেন।
এছাড়া নিজেদের লোকসান পুষিয়ে নিতেও অনেক সময় সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকার কী বলছে?
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হাতে দেওয়া হলেও প্রবিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় কমিশন সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না।
ফলে কার্যত এখন মন্ত্রণালয়ই জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করছে। বিইআরসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবিধিমালার খসড়াও সেখানে আটকে রয়েছে।
“তারা এটার অনুমোদন দিয়ে দিলেই তখন আইন অনুযায়ী আমরা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে ব্যবস্থা নিতে পারবো,” বলেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, গত দুই বছর স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছিল বাংলাদেশ সরকার। তবে সর্বশেষ দাম বাড়ানোর সময় এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ করলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেত। এ কারণেই এবার পদ্ধতিটি অনুসরণ করা হয়নি।
কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
এই বিপুল লোকসান কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি তেল চোরাচালানের ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
“এমতাবস্থায় সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবং প্রবাসী ভাইদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানি তেল যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে যেন পাচার হয়ে যেতে না পারে সে কারণে সরকারকে এই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে” বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
পড়ুন : অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আর্থিক লেনদেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা
সা/


