গোয়ালিয়রের সাধারণ এক পরিবারের ছেলে থেকে বলিউডের পরিচিত মুখ—কার্তিক আরিয়ানের এই যাত্রাপথে ছিল স্বপ্ন, সংগ্রাম ও দীর্ঘ অপেক্ষা। অভিনয়ের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে একসময় ছোট শহর ছেড়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। পথটা সহজ ছিল না। তবে নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল থেকে একের পর এক বাধা পেরিয়েছেন। এবার সেই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম বড় স্বীকৃতি পেলেন কার্তিক আরিয়ান। ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান অর্জন করেছেন তিনি।
গুজরাটে অনুষ্ঠিত ৭১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে ‘রজত কমল’ ও সম্মাননা সনদ গ্রহণ করেন কার্তিক। ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’ সিনেমায় ভারতের প্রথম প্যারাঅলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী সাঁতারু মুরলিকান্ত পেটকরের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এই সম্মান পেয়েছেন অভিনেতা।
পুরস্কার গ্রহণের সেই মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কার্তিক। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মাননা নেওয়ার সময় তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ ও আবেগ। যেন এক মুহূর্তে ফিরে গিয়েছিলেন বহু বছর আগের সেই সময়ে, যখন গোয়ালিয়রের এক তরুণ অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে কার্তিক লিখেছেন, গোয়ালিয়রের সেই সাধারণ ছেলেটির দিকে আজ তিনি পিছন ফিরে হাসিমুখে তাকাচ্ছেন। এমন একটি পরিবেশ থেকে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি, যেখানে মানুষ সেই স্বপ্নের কথা শুনে হাসতেও পারত। কিন্তু সেই স্বপ্নই যে একদিন বাস্তবে পরিণত হবে, তা হয়তো তখন কল্পনাও করা কঠিন ছিল।
কার্তিক আরও জানান, অবশেষে সেই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে পেরে তিনি আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। পুরস্কার হাতে পাওয়ার পরও আবেগের তীব্রতায় নিজেকে কিছুটা অনুভূতিহীন মনে হচ্ছিল বলেও জানান অভিনেতা।
‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’-এর জন্য কার্তিকের প্রস্তুতিও ছিল কঠোর। মুরলিকান্ত পেটকরের চরিত্রটি পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে নিজের শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে চরিত্রের শরীরী ভাষা ও মানসিকতার ওপর বিশেষভাবে কাজ করেছিলেন তিনি। একজন ক্রীড়াবিদের জীবন, সংগ্রাম, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি—সবকিছুই অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন কার্তিক।
চলচ্চিত্রে মুরলিকান্ত পেটকরের জীবনের অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। পেটকর ছিলেন ভারতের প্রথম প্যারাঅলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী। তার জীবনের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্পকে পর্দায় তুলে ধরার দায়িত্ব ছিল কার্তিকের ওপর। সেই চরিত্রে অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবেই এবার জাতীয় পুরস্কার পেলেন তিনি।
তবে এ বছরের সেরা অভিনেতার পুরস্কার কার্তিক একা পাননি। যৌথভাবে এই সম্মান পেয়েছেন মালয়ালম চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা মাম্মুটিও। ‘ব্রহ্মযুগম’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ফলে একই বিভাগে দুই ভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রের দুই তারকার পুরস্কারপ্রাপ্তি এবারের আয়োজনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
নিজের এই অর্জনের জন্য ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’-এর পরিচালক কবির খান এবং প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কার্তিক। মুরলিকান্ত পেটকরের মতো একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াকে নিজের ক্যারিয়ারের বিশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন তিনি।
কার্তিকের কথায়, এই চরিত্রের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। চরিত্রটিকে পর্দায় যথাযথভাবে তুলে ধরতে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তবে সেই কঠিন পথ পেরিয়ে পাওয়া স্বীকৃতির আনন্দ তার কাছে অত্যন্ত মধুর। নিজের অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে তিনি পুরস্কার পাওয়ার স্বাদকে ‘রসমলাইয়ের মতোই মিষ্টি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর কার্তিক এই সম্মান নিজের পরিবার, বন্ধু এবং ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’-এর পুরো দলের প্রতি উৎসর্গ করেছেন। একইসঙ্গে দেশের প্রতিটি প্যারাঅলিম্পিয়ান এবং সেইসব মানুষকেও স্মরণ করেছেন, যারা অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখেন।
গোয়ালিয়র থেকে মুম্বাই, সেখান থেকে বলিউড এবং এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চ—কার্তিক আরিয়ানের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে তার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একসময় যে স্বপ্নকে ঘিরে মানুষ হাসতে পারত, সেই স্বপ্নই আজ তাকে এনে দিয়েছে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র সম্মান। ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’-এর মুরলিকান্ত পেটকর হয়ে পর্দায় যে গল্প বলেছিলেন কার্তিক, জাতীয় পুরস্কার তার নিজের জীবনযাত্রার গল্পকেও যেন নতুন এক অধ্যায়ে পৌঁছে দিল।
পড়ুন:রানি মুখার্জির মা কৃষ্ণা মুখার্জি আর নেই
ইমি/


