গাইবান্ধা জেলা শহরজুড়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) চোখধাঁধানো সাইনবোর্ড আর বিলাসবহুল কার্যালয়ের ছড়াছড়ি থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। দাতাসংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো বার্ষিক প্রতিবেদনে দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও নারী-শিশু পাচার রোধের মুখরোচক সাফল্যের বিবরণ দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব মিলছে না। নদীভাঙন, বেকারত্ব ও জলবায়ু সংকটে জর্জরিত চরাঞ্চলের মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্রগুলো নির্বিঘ্নে তাদের জাল বিস্তার করলেও স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী এনজিওগুলোর রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তার দুর্গম চরগুলো এখন মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম অভয়ারণ্য। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো নিঃস্ব পরিবারের তরুণ-তরুণীদের ভালো চাকরি, পোশাক কারখানায় কাজ বা বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে এবং কম বয়সী মেয়েদের ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলে দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমক্ষেত্র এমনকি সীমান্ত পেরিয়ে পাচার করা হচ্ছে।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, এনজিওগুলো প্রতি বছর পাচার প্রতিরোধ ও অধিকার সুরক্ষার নামে দেশি-বিদেশি বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করলেও তাদের মূল কার্যক্রম দৃশ্যত কেবল ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
চরাঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ ও আইনি সহায়তার অভাবে ফুলছড়ির এরেন্ডাবাড়ী চরের এক ভুক্তভোগী অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কিস্তির টাকার জন্য এনজিওর লোকজন ঠিকই দরজায় কড়া নাড়ে। কিন্তু এলাকার ছেলেমেয়েরা দালালের মিষ্টি কথায় সীমান্ত পেরিয়ে হারিয়ে গেলেও কাউকে কখনো সতর্ক করতে দেখিনি। কোনো ছেলেমেয়ে নিখোঁজ হলে বা পাচারের শিকার হলে আইনি সহায়তার জন্য কোনো এনজিওর ছায়াও খুঁজে পাওয়া যায় না।”
আইনি অজ্ঞতা এবং তথ্যের চরম ঘাটতিকে পাচারকারীরা তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তৃণমূলের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশও ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
এনজিও ব্যুরোর নীতিমালা অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে আইনি সচেতনতা ও দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার জন্য প্রতিরোধ সেল থাকার কথা থাকলেও, গাইবান্ধার মাঠপর্যায়ে কোনো এনজিওর কার্যকর ট্র্যাকিং সেল, ভুক্তভোগী শেল্টার হোম বা সরাসরি আইনি সহায়তা ডেস্ক নেই।
লোকদেখানো সেমিনার ও ফটোসেশনে সীমাবদ্ধ কার্যক্রম
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন মহলের ভাষ্যমতে, জেলা শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁয় সেমিনার, কর্মশালা আর লোকদেখানো ব্যানার টাঙিয়ে ফটোসেশনেই শেষ হয় এনজিওগুলোর তথাকথিত সচেতনতামূলক প্রকল্প। পাচারপ্রবণ দুর্গম চরাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোর কাছে পৌঁছায় না এসব প্রকল্পের সামান্য সুফলও। নজরদারির এই কাঠামোগত ব্যর্থতার সুযোগে পাচারচক্রগুলো কোনো রকম বাধা ছাড়াই চরের দরিদ্র মানুষকে সর্বস্বান্ত করে চলেছে।
শুধু নথিপত্রে কাগুজে হিসাব দেখিয়ে তহবিল সংগ্রহের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে এনজিওগুলোর পাচারবিরোধী বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্গম চরাঞ্চলে নিবিড় নজরদারিসহ কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন গাইবান্ধার সচেতন মহল।
পড়ুন : পূর্বধলায় সার ও ফার্মেসিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত: জরিমানাসহ ৫৩ বস্তা জব্দ


