বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপড়েন অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিকবার ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হলেও সীমান্ত পরিস্থিতি, পুশইন এবং ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনগুলোতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়মিতই উঠে এসেছে। এসব সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় পক্ষ দুই দেশের জনগণের স্বার্থে সম্পর্ককে গঠনমূলক ও ইতিবাচক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
তবে কূটনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, কথিত পুশইন এবং বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেখা গেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জনপরিসরে ভারত-বিরোধী মনোভাবও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
এর মধ্যেই ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠককে ঘিরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের কয়েকজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকের মতে, শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, একদিকে ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক রহমত উল্লাহর মতে, ভারতের নীতিতে এক ধরনের দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য, একদিকে ভারত বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলছে, অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে তার মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা বা সংগঠিত করার কোনো ধরনের উদ্যোগ থাকলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ভারত সরকারের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
শেখ হাসিনাকে এনডিটিভির সাক্ষাৎকারে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টিও বাংলাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে উল্লেখ করা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ভারতের অবস্থানের পার্থক্যকে সামনে আনে।
রহমত উল্লাহর মতে, শেখ হাসিনাকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তার আশঙ্কা, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে এমন বিশ্লেষণ বা অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো সরকারি প্রমাণ সামনে আসেনি। একইভাবে বাংলাদেশে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে ভারতের কোনো পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে—এমন দাবিও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে এসব বিষয়কে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিকদের মতে, সীমান্তে প্রাণহানি ও পুশইনের মতো ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের চেষ্টার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দিল্লিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
তার মতে, সম্পর্কের যে ক্ষতি আগে থেকেই হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেটিকে আরও গভীর করেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিকভাবে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়লে দুই দেশের জন্যই নানা ধরনের বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অংশীদার। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখা এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ বা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে ভারতের কাছে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান জানিয়েছে। ভারতও বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছে। এই ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক বর্তমানে একাধিক জটিল ইস্যুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্কের গুরুত্বের কথা বলছে, অন্যদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি, শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলছে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক সন্দেহ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে দায়িত্বশীল যোগাযোগ জরুরি। দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে আলোচনার পথে এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
পড়ুন:আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
ইমি/


