বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাওরের জলে ফুটল সাফল্যের পদ্ম: বিচারালয়ে শুভর জয়যাত্রা

চারদিকে থৈ থৈ জলরাশি। বর্ষা এলেই চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পুরো গ্রাম। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে পায়ে হাঁটার মেঠোপথ- সবই চলে যায় জলের নিচে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব যেখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেখানে স্বপ্ন দেখাও যেন এক বিলাসী কল্পনা। কিন্তু নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার প্রত্যন্ত জগন্নাথপুর গ্রামের এক তরুণ প্রমাণ করেছেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে হাওরের দুর্গম পথ পেরিয়েও পৌঁছে যাওয়া যায় সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে।

বিজ্ঞাপন

গ্রামের সাধারণ কাপড়ের দোকানির ছেলে শুভ আহমেদ। শত প্রতিকূলতা জয় করে তিনি এবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন। দেশজুড়ে দুইশো জন উত্তীর্ণ প্রার্থীর মধ্যে ৮০তম স্থান অর্জন করে মেধাতালিকায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন হাওরপাড়ের এই অদম্য মেধাবী।

শুভর সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প, যার প্রধান রূপকার তার বাবা মো. কুদ্দুস মিয়া। জগন্নাথপুর গ্রামের ছোট্ট কাপড়ের দোকানই এই পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। সামান্য আয়ে সংসারের দৈনন্দিন ঘানি টানার পাশাপাশি ছেলের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা মোটেও সহজ ছিল না। দারিদ্র্য বা পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতা কুদ্দুস মিয়ার স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অভাবের সংসারেও ছেলেকে তিনি দিয়েছেন বুকভরা সাহস আর সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করা সমর্থন।

হাওরের কাদাপানিতে বেড়ে ওঠা শুভ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পড়াশোনায় তীক্ষ্ণ। যখন গ্রামের স্কুলগুলোতে ভালো ফলাফল করা রীতিমতো সংগ্রাম, তখন নিজ বিদ্যালয় থেকে প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে চমক দেখান তিনি। এরপর ময়মনসিংহের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে সাফল্যের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক গণ্ডি পেরোন। শুভর লক্ষ্য ছিল আরও বহুদূর। নিজের মেধা আর পরিশ্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় নবম স্থান অর্জন করে তিনি জানান দেন, হাওরের ছেলেরাও দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠে রাজত্ব করতে জানে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পা রাখার পর থেকেই শুভর চোখে ছিল বিচারক হওয়ার স্বপ্ন। তিনি বলেন, “আইন বিভাগে ভর্তির পর থেকেই জজ বা অ্যাডমিন ক্যাডার হওয়ার সুপ্ত বাসনা কাজ করত। বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর মায়ের স্বপ্ন আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেছে। আমি সবসময় চেয়েছি নিজের একটা আলাদা পরিচিতি বা ভ্যালু তৈরি করতে।”

সাফল্যের মূলমন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে শুভ জানান, তিনি নিজেকে কখনো ফাঁকি দেননি। দীর্ঘ প্রস্তুতির পুরোটা সময় তিনি পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত কৌশলী ও ধারাবাহিক।

সহকারী জজ হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ দায়িত্ববোধ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন এই তরুণ। বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করে শুভ বলেন, “আদালত হলো সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং শেষ আশ্রয়ের জায়গা। মানুষ যখন সব জায়গা থেকে নিরুপায় হয়ে যায়, তখনই আদালতের দ্বারস্থ হয়। আমি সবসময় চেষ্টা করব আমার আইনি জ্ঞান, পেশাগত বাধ্যবাধকতা এবং মানবিকতার জায়গা থেকে মানুষকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে।”

শুভর অনন্য অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো জগন্নাথপুর গ্রামসহ খালিয়াজুরীতে আনন্দের বন্যা বইছে। স্থানীয়দের কাছে এটি নিছক কোনো চাকরির খবর নয়, বরং হাওরের পিছিয়ে পড়া জনপদের জন্য বিশাল জাগরণ। গ্রামের ছোট দোকানের উপার্জনে পড়াশোনা করে জাতীয় পর্যায়ের এমন কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়া- সত্যিই অভাবনীয়।

শুভ আহমেদের সাফল্যগাথা কেবল একজন তরুণের বিচারক হওয়ার গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে যে, সীমিত সুযোগ আর ভৌগোলিক দুর্গমতা কখনোই মেধা ও পরিশ্রমের পথে বাধা হতে পারে না। হাওরের অথৈ জলে ফুটে ওঠা এই সাফল্যের পদ্ম এখন পুরো ভাটি অঞ্চলের হাজারো তরুণের চোখে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে।

পড়ুন : সরকার ও ইসির সমন্বয়হীনতা, এ বছর হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন