লোকসানি সমিতির ‘ভুতুড়ে’ তহবিল: লাখ টাকার পাম্প এলো কোথা থেকে?

উন্নয়নের স্বপ্ন আর সঞ্চয়ের ভরসা নিয়ে সমবায় বা যুব উন্নয়ন সমিতিগুলোতে যুক্ত হন সাধারণ মানুষ। সেই ভরসার জায়গাটি যখন অস্বচ্ছতা আর নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমে রূপ নেয়, তখন সদস্যদের আশার বিপরীতে কেবল হতাশাই জোটে। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় নাজিরপুর ইউনিয়নে ভবানীপুর এলাকায় এমনই এক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে একই ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত তিনটি সংগঠনের কার্যক্রম, বিশেষ করে সাবমার্সিবল পাম্প ও ঋণ বিতরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে বিস্তর অসংগতি।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ অনুসন্ধানে সংগঠনগুলোর নথিপত্র, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ভবানীপুর এলাকায় একই কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে তিনটি ভিন্ন নামের সংগঠন- ‘রামপুর-কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন সমিতি’, ‘কুবরীকান্দা আদর্শ শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ এবং ‘রামপুর-কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড’। মজার বিষয় হলো, এই তিনটি সংগঠনেরই সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বা চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসে আছেন নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সদস্য জানান, উপজেলা সমবায় ও যুব উন্নয়ন দপ্তরের কার্যকর তদারকির অভাবেই সংগঠনগুলো যেন ‘একক সিদ্ধান্তে’ পরিচালিত হচ্ছে। সদস্যদের অভিযোগ- ঋণ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হলেও দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। এমনকি দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয়ের টাকা তুলতে গেলেও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ সদস্যদের।

সম্প্রতি সদস্যদের মধ্যে সাবমার্সিবল পাম্প বিতরণের উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি। এই কার্যক্রম ঘিরেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ সদস্যদের তথ্যমতে, একটি পাম্প পাওয়ার জন্য জনপ্রতি ১০ হাজার পাঁচশো টাকা, ব্যানার বাবদ পাঁচশো টাকা এবং আনুষঙ্গিক খরচসহ ১২ হাজার ২২৫ টাকা জমা নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই টাকায় কাগজে-কলমে তিনশো ফুট গভীরতার সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করে দেওয়া হবে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাবমার্সিবল পাওয়া একাধিক সদস্যের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি পাম্প মাত্র ১৮০ থেকে ২৫০ ফুট গভীরতায় স্থাপন করা হয়েছে। তিনশো ফুট গভীরতার পাম্প পেয়েছেন- এমন সদস্যের সংখ্যা হাতে গোনা।

খারনৈ ইউনিয়নের বাসিন্দা খোরশেদ আলম জানান, নানা সুবিধার প্রলোভনে পড়ে প্রায় তিন মাস আগে তার নেতৃত্বে ৩০ জন সদস্য প্রত্যেকে ১২ হাজার ২২৫ টাকা করে সংগঠনে জমা দেন। এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়জন পাম্প পেয়েছেন। বাকিরা কবে পাবেন, সে বিষয়ে সংগঠনের কাণ্ডারি নজরুল ইসলাম কোনো স্পষ্ট সদুত্তর দিতে পারছেন না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গণমাধ্যমকর্মীরা সরাসরি হাজির হন নজরুল ইসলামের কার্যালয়ে। টানা প্রায় আড়াই ঘণ্টার আলাপচারিতায় তিনি নানা দাবি করলেও, এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

নজরুল ইসলাম জানান, দুটি সংগঠনের মাধ্যমে ৩৬০ জন সদস্যকে সাবমার্সিবল পাম্প দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিক কতজনকে পাম্প দেওয়া হয়েছে আর কতজন অপেক্ষায় আছেন- তার কোনো সুস্পষ্ট তালিকা তিনি দেখাতে পারেননি।

পাম্প কেনার ক্ষেত্রে কোনো দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়েছিল কি-না- এমন প্রশ্নে তিনি (নজরুল ইসলাম) জানান, কোনো দরপত্র হয়নি। ছয় সদস্যের কমিটির সিদ্ধান্তে সরাসরি কেনা হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, লাখ লাখ টাকার পাম্প কেনার কোনো রশিদ, ভাউচার বা সরবরাহকারীর চালানও তিনি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন।

অর্থের উৎস সম্পর্কে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তার সংগঠনগুলোর কল্যাণ তহবিলে ৩০ লাখ টাকা জমা ছিল, যেখান থেকে পাম্প কেনার জন্য ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলনের কোনো নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিগত সময়ের অডিটে সংগঠনটিতে লোকসানের তথ্য পাওয়া গেছে। সমবায় আইনের বিধি অনুযায়ী, কোনো সংগঠন লাভে না থাকলে সেখানে কল্যাণ তহবিলে অর্থ জমা হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।” তিনি আরও জানান, দরপত্র ছাড়া কেনাকাটা এবং সাধারণ সভার অনুমোদন ছাড়া বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়মবহির্ভূত। এসব ক্ষেত্রে তথ্যের গরমিল প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ঋণ বিতরণ প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম দাবি করেছিলেন, তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ১৭ লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন। কিন্তু কলমাকান্দা উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম এই দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, “যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো ঋণ দেওয়া হয় না। নাজিরপুরে ‘রামপুর-কুবরীকান্দা যুব উন্নয়ন সমিতি’ নামে নিবন্ধন থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।”

দাবিকৃত ১৭ লাখ টাকার ঋণের আসল উৎস কী, লোকসানে থাকা সংগঠনের কল্যাণ তহবিলে ১৮ লাখ টাকা কোথা থেকে এলো, আর দরপত্র বা ভাউচার ছাড়া লাখ লাখ টাকার পাম্প কীভাবে কেনা হলো- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অধরা। তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল এমন অসংগতিগুলোর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ সদস্যরা। আপাতত নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক হিসাব ও প্রতিশ্রুত সুবিধার আশায় দিন গুনছেন তারা।

নিবন্ধিত সমবায় সমিতির ব্যয় নির্বাহের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নেত্রকোনা জেলা সমবায় কার্যালয়ের সাবেক পরিদর্শক মানজার হোসেন জানান, সমবায় সমিতির যেকোনো কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বাজেট পাস করতে হয়। অনুমোদিত বাজেটের আওতায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচের জন্য উপজেলা বা জেলা সমবায় কর্মকর্তার অনুমতি প্রয়োজন হয় এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে জয়েন্ট রেজিস্ট্রারের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।

সার্বিক বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা সমবায় কার্যালয়ের বর্তমান জেলা সমবায় কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, বার্ষিক সাধারণ সভা এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমিতিগুলো তাদের নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে পারে। তবে সদস্যদের কাছ থেকে টাকা তুলে টিউবওয়েল বা সাবমার্সিবল পাম্প বিতরণের কোনো সুযোগ সমবায় সমিতির নীতিমালায় নেই।

তিনি আরও জানান, আয় না থাকলে সদস্যদের শেয়ার বা সঞ্চয়ের মূলধন ভেঙে এ ধরনের সামাজিক কাজ বা ব্যয়ের কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখার ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এই সমবায় কর্মকর্তা।

তদারকি সংস্থাগুলোর এমন সুস্পষ্ট নিয়মের পরও কীভাবে দিনের পর দিন ভবানীপুর এলাকায় এমন অনিয়ম চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। আপাতত নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক হিসাব ও সুষ্ঠু বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন সাধারণ সদস্যরা।

পড়ুন:মৃত্যুফাঁদে পরিণত বড়লেখা পৌর মার্কেট,জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাণিজ্য চালাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন