জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিসহ অর্ধশতাধিক বিশ্বনেতা অংশ নেননি। তাদের অনুপস্থিতির পেছনে অসুস্থতা থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়কে কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বিশ্বনেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সাধারণত খুব কম নেতাই এতে অনুপস্থিত থাকেন। এবারের অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও এমানুয়েল মাখোঁসহ অনেক বিশ্বনেতা যোগ দিয়েছেন। সবুজ মার্বেলের বক্তৃতামঞ্চে তাদের দেয়া বক্তব্যও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে যারা এবার অংশ নেননি, তাদের অনুপস্থিতি আলাদাভাবে আলোচনায় এসেছে।
জার্মানি: ফ্রিডরিখ মেরৎস
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস দায়িত্বের দ্বিতীয় বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নিজেকে তিনি ‘পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক চ্যান্সেলর’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তাকে বর্তমানে ব্যস্ত রেখেছে।
সেপ্টেম্বরে জার্মানির তিনটি রাজ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর পর চ্যান্সেলর ও ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) নেতা হিসেবে মেরৎস আগের তুলনায় বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন। স্যাক্সনি-আনহাল্ট ও বার্লিনে সিডিইউ দৃঢ়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে মেকলেনবুর্গ-ভেস্টার্ন পোমেরানিয়ায় দলটি রাজ্য পার্লামেন্টে জায়গা করে নিতে পারেনি। জার্মান ফেডারেল রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর এমন ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকার কারণে মেরৎস এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যাননি। তার অনুপস্থিতির সুযোগে বিরোধীরা যাতে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করতে না পারে, সেটিও তিনি ঠেকাতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে। তার পরিবর্তে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল জাতিসংঘে বক্তব্য দেন।
ইতালি: জর্জিয়া মেলোনি
জার্মানির মেরৎসের তুলনায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবুও তিনি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে তাকে ইতালির অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সামলাতে হবে।
জুলাইয়ের শুরুতে ন্যাটো সম্মেলনের পর মেলোনি বলেছিলেন, তিনি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে মাত্র ফিরেছেন। একই সঙ্গে ইতালির অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়সহ বিভিন্ন ইস্যু মোকাবিলা করতে হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
সে সময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ২০২৫ সালেও মেরৎস জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুপস্থিত ছিলেন। এবার মেলোনিও নিজে না গিয়ে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিকে পাঠিয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা: সিরিল রামাফোসা
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেননি। এর আগে তিনি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।
স্বাস্থ্যগত কারণেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকেরা তাকে বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হওয়ার জন্য সময় দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে রামাফোসার কার্যালয় তার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি।
মিসর: আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি
আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও এবার নিউইয়র্কে যাননি। তার পরিবর্তে মিসরের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা মাদবুলি। তবে সিসির অনুপস্থিতির কারণ তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়নি।
২০১৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন সিসি। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির কারণে অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর অধিবেশনটি হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজন করা হলে সিসি আগে ধারণ করা ভিডিও বার্তা পাঠান। এরপর সাধারণ পরিষদের বৈঠক সরাসরি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তিনি আর এতে যোগ দেননি।
নাইজেরিয়া: বোলোয়া টিনুবু
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলোয়া টিনুবুও এবারের ইউএনজিএতে অনুপস্থিত রয়েছেন।
নাইজেরিয়ার সংবাদমাধ্যম তার মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির ‘পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরভাবে প্রতিনিধিত্ব’ করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশিম শেত্তিমা। অন্যদিকে টিনুবু ছুটিতে রয়েছেন। আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে সময় কাটানোর পর তিনি ফ্রান্সে যান।
ভারত: নরেন্দ্র মোদি
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল। সর্বশেষ ২০২১ সালে তিনি এই মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এরপর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটি নিয়মিতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে জাতিসংঘে পাঠাচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের অধিবেশনে বক্তা হিসেবে মোদির নাম তালিকাভুক্ত ছিল। পরে তার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। তবে তিনি কেন শেষ পর্যন্ত যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা জানা যায়নি।
চীন: শি জিনপিং
এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ‘হাই-লেভেল উইক’ চলাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলেন, কিন্তু নিউইয়র্কে যাননি।
এর পরিবর্তে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বা ১৮৫ মাইল দূরের ওয়াশিংটনে সরাসরি যান শি। সেখানে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেন। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
রাশিয়া: ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতামঞ্চে খুব কমই উপস্থিত হয়েছেন। এবারও তার পরিবর্তে রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড: মাহমুদ আব্বাস
ইউএনজিএতে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার দিক থেকে তালিকায় থাকা অন্য নেতাদের তুলনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের উপস্থিতি অনেক বেশি। ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।
তবে গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তাকে কূটনৈতিক ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এবারও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে আব্বাস সশরীরে জাতিসংঘে না গিয়ে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন।
অবশ্য ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ সদর দপ্তর চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি প্রতিনিধিদের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর উদাহরণ হিসেবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। যদিও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা এমন নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে, ‘যার মাধ্যমে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সদস্যদের ভিসা দেয়া বন্ধ করা হয়।’
গত বছরের মতো এবারও মাহমুদ আব্বাস ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন।
সূত্র: ডয়চে ভেলে।


